ওয়াশিংটন ডিসি, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬: ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো, যিনি ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাঁর সোনার নোবেল মেডেল উপহার দিয়েছেন। এই অত্যন্ত প্রতীকী ও বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভিযানের মাত্র দু’সপ্তাহ পর, যার ফলে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।মাচাদো, যিনি ২০২৫ সালের অক্টোবরে নরওয়ে নোবেল কমিটির কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন “ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রচারে অবিরাম প্রচেষ্টা এবং স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের জন্য সংগ্রাম”-এর জন্য, এই উপহারকে “ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার প্রতি ট্রাম্পের অনন্য প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতি” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ঐতিহাসিক উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১৮২৫ সালে মার্কুইস দে লাফায়েত সিমন বলিভারকে জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি সম্বলিত একটি সোনার মেডেল উপহার দিয়েছিলেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্প একটি বড় সোনালি ফ্রেমে মেডেলটি ধরে আছেন। ফ্রেমের নিচে লেখা আছে: “ভেনেজুয়েলার জনগণের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিগত ও দৃঢ় পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি মুক্ত ভেনেজুয়েলা নিশ্চিত করার জন্য।” ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, এটি “পারস্পরিক সম্মানের এক অসাধারণ অঙ্গভঙ্গি” এবং মাচাদোকে “একজন অসাধারণ নারী যিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন” বলে অভিহিত করেছেন।
মাচাদো দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো সরকারের কঠোর সমালোচক। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি গোপনে ভেনেজুয়েলা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর মেয়ে তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন। নোবেল কমিটি তাঁকে “শান্তির সাহসী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ চ্যাম্পিয়ন” বলে প্রশংসা করেছিল।এই উপহারের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩ জানুয়ারি ২০২৬-এ মার্কিন বাহিনী “অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ” নামে কারাকাসে অভিযান চালায় এবং মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসে। এই অভিযানে সাইবার আক্রমণ, হেলিকপ্টার ও বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রাম্প এটিকে “আইন প্রয়োগের কাজ” বলে দাবি করেছেন, কিন্তু চীন, ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ ১০০টিরও বেশি দেশ এটিকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন (অনুচ্ছেদ ২(৪)) বলে নিন্দা করেছে।
নরওয়ে নোবেল ইনস্টিটিউট তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়েছে যে পুরস্কার “প্রত্যাহার, ভাগ বা অন্যকে হস্তান্তর করা যায় না”, যদিও শারীরিক মেডেল হাতবদল হতে পারে। নরওয়ের রাজনীতিবিদরা এটিকে “অযৌক্তিক” বলে সমালোচনা করেছেন এবং ট্রাম্পকে “অন্যের কাজের কৃতিত্ব নেওয়া শো-অফ” বলে অভিহিত করেছেন।সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এই ঘটনাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতার আরও একটি আঘাত বলে মনে করছেন, বিশেষ করে অতীতের বিতর্কিত পুরস্কার (যেমন ২০০৯-এ ওবামাকে) স্মরণ করে। মাচাদোর সমর্থকরা এটিকে মার্কিন চাপের জন্য কৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।
ভেনেজুয়েলা এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মাচাদো প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হয়ে দেশের পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দিতে চান, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তেলের স্বার্থে এক্টিং প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।এই ঘটনা নোবেল শান্তি পুরস্কারের রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে এটি “শক্তির মাধ্যমে শান্তি” নামে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করতে পারে।বর্তমানে মেডেলটি হোয়াইট হাউসে ফ্রেমে স্থাপিত। এটি ভূ-রাজনীতি, ব্যক্তিগত প্রতীকবাদ ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম কীভাবে অপ্রত্যাশিতভাবে মিলেমিশে যায় তার এক জ্বলন্ত স্মারক। নোবেল কমিটির নিয়ম অনুসারে পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে মাচাদোরই থাকবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
