কলকাতা, ১৬ জুলাই: সন্দেহের বশে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার এক চরম অমানবিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ওপার বাংলায় অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং চরম মানবিক দুর্ভোগ সহ্য করার পর অবশেষে নিজেদের মাতৃভূমি ভারতে ফিরে এসেছেন দুটি পরিবারের সদস্যরা। এই ঘটনায় সীমান্ত অঞ্চলের প্রশাসনিক গাফিলতি এবং নিরপরাধ ভারতীয়দের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
আজ এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাৎ করেন রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তিনি সুইটি বিবি, তাঁর দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং সুনালি খাতুনের স্বামীর সঙ্গে কথা বলেন। দীর্ঘদিন পর স্বদেশে ফিরলেও তাঁদের চোখে-মুখে এখনও ওপার বাংলার সেই বন্দিদশার আতঙ্ক স্পষ্ট। সাংসদ সুনালির ছোট্ট সন্তানের সাথেও বেশ কিছুটা সময় কাটান এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফিরে আসা এই মানুষগুলো প্রত্যেকেই আইনত এবং জন্মসূত্রে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক। সমস্ত বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র প্রাথমিক সন্দেহের ভিত্তিতে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হয় এবং কোনো রকম পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ছাড়াই সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করা হয়।
সাংসদ সামিরুল ইসলাম এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই ধরনের প্রশাসনিক ভুল শুধু একটি সাধারণ আইনি ত্রুটি বা গাফিলতি নয়; এটি নিরপরাধ মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং মানবিক নিরাপত্তার উপর এক গভীর ও অপূরণীয় আঘাত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কীভাবে বৈধ নাগরিকদের এভাবে নির্বাসনে পাঠানো হতে পারে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশাসনের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় সরকারের কাছেই জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে। দাবি উঠেছে, এই পরিবারগুলোর দ্রুত ও উপযুক্ত পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক-মানসিক সহায়তা অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে, সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে এমন একটি কার্যকর ও নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে বা প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে এমন অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে না হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের মতে, অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে দেশের কোনো নাগরিকেরই আপত্তি থাকার কথা নয়। সার্বভৌম রাষ্ট্রের সুরক্ষায় অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতেই হবে। কিন্তু তার নামে প্রকৃত ও নিরপরাধ ভারতীয় নাগরিকদের হয়রানি করা, জোরপূর্বক নির্বাসন দেওয়া এবং অমানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
ভারতবর্ষ আমাদের সকলের মাতৃভূমি। জাত, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এই দেশ প্রতিটি ভারতীয়ের সমান আশ্রয় ও অধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার বহন করে। একজন মা যেমন তাঁর প্রতিটি সন্তানকে সমান স্নেহ ও নিরাপত্তা দিয়ে আগলে রাখেন, ঠিক তেমনই রাষ্ট্রেরও পরম দায়িত্ব প্রতিটি প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের মর্যাদা, আইনি অধিকার ও জীবনযাপনের নিরাপত্তা অটুট রাখা। এই ঘটনায় জড়িত দোষী আধিকারিকদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
