বেঙ্গালুরু, ১৬ জুলাই: শিক্ষিকার কঠোর শারীরিক শাস্তি এবং চরম মানসিক হেনস্থা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করল ১৩ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্র। বর্তমানে বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে সপ্তম শ্রেণীর ওই পড়ুয়া। তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম বেঙ্গালুরুর জ্ঞানভারতী থানার অন্তর্গত মারিয়াপ্পানাপাল্য এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, গত মঙ্গলবার স্কুলে অন্য এক সহপাঠীর সঙ্গে প্রজেক্ট সংক্রান্ত বিষয়ে ওই ছাত্রের সামান্য বচসা ও হাতাহাতি হয়। অভিযোগ, এরপরই ক্লাসরুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ওই ছাত্রকে অত্যন্ত কঠোরভাবে বকাঝকা করেন এবং তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করেন। শাস্তি হিসেবে তাকে সারা দিন ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রকাশ্য শাস্তি এবং সহপাঠীদের সামনে তীব্র অপমান সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ১৩ বছরের ওই কিশোর। এর পাশাপাশি স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, পরের দিন যেন সে অবশ্যই তার বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে আসে। এই নির্দেশ ছেলেটির মনে চরম ভীতি ও মানসিক ট্রমার সৃষ্টি করে।
স্কুল ছুটির পর বিকেলের দিকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে ফেরে ওই ছাত্র। এর কিছুক্ষণ পর তার ভাই যখন বাড়ির বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যায়, সেই সুযোগে ঘরের ভেতর গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। কিছু সময় পর তার ভাই কোনো একটি প্রয়োজনে বাড়িতে ফিরে এসে ভাইকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। তার চিৎকার ও তৎপরতায় পরিবারের অন্য সদস্য এবং প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তড়িঘড়ি ছেলেটিকে উদ্ধার করেন। রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় তাকে অবিলম্বে নায়াণ্ডাহাল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানেই ভেন্টিলেশনে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে সে।
আক্রান্ত ছাত্রের বাবা পেশায় একজন মুদি দোকানদার এবং মা-ও একটি দোকানে কাজ করেন। ছাত্রটির পরিবারের অভিযোগ, ছেলেটি রাইট টু এডুকেশন (আরটিই) কোটায় ওই নামী বেসরকারি স্কুলে ভরতি হয়েছিল। এর আগেও স্কুলের শিক্ষিকা, ম্যানেজমেন্টের সদস্য এবং সহপাঠীদের একাংশ তাকে পড়াশোনা ও জাতি তুলে নানাভাবে কটূক্তি ও মানসিক হেনস্থা করত। ছাত্রটি বেশ কিছুদিন ধরেই তার বাবা-মাকে জানিয়েছিল যে সে ওই স্কুলে আর পড়তে চায় না। বাবা-মা তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, সপ্তম শ্রেণী পাস করলেই তাকে অন্য স্কুলে ভরতি করে দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গেল।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই জ্ঞানভারতী থানার পুলিশ সক্রিয় হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) এবং জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের একাধিক ধারায় স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রঙ্গস্বামী, প্রিন্সিপাল এবং দুই-তিনজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিসিপি (দক্ষিণ-পশ্চিম) জানিয়েছেন, ছাত্রটির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তারা চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে। অভিযুক্তদের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে, স্কুল ম্যানেজমেন্ট জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, দুই ছাত্রের মারামারির কারণে ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই ছাত্রটিকে সতর্ক করা হয়েছিল এবং অভিভাবককে ডেকে আনতে বলা হয়েছিল। তারা পুলিশের তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে বলেও জানিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে বেঙ্গালুরুতে ছাত্র নিগ্রহ ও আত্মহত্যার চেষ্টার এটি দ্বিতীয় ঘটনা, যা শহরের শিক্ষাঙ্গনে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

