ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল কুইক কমার্স খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে ব্লিঙ্কিট, জেপ্টো, সুইগি ইনস্টামার্ট এবং জোমাটোর মতো প্রধান প্ল্যাটফর্মগুলি তাদের বিজ্ঞাপন, অ্যাপ এবং ব্র্যান্ডিং থেকে ‘১০ মিনিটে ডেলিভারি’র দাবি সরিয়ে ফেলছে। এই পদক্ষেপ ডেলিভারি কর্মীদের (গিগ ওয়ার্কার) নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের উন্নতির জন্য নেওয়া হয়েছে।জানুয়ারি ১৩, ২০২৬-এর সূত্রের খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডবিয়া ব্লিঙ্কিট, জেপ্টো, সুইগি এবং জোমাটোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, অতি দ্রুত ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি (১০-১৫ মিনিট) ডেলিভারি রাইডারদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা তাদের সড়ক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। এর ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার ঘটনা ঘটছে।ব্লিঙ্কিট ইতিমধ্যেই তাদের ট্যাগলাইন পরিবর্তন করেছে। আগে যেখানে লেখা থাকত “১০,০০০+ পণ্য ১০ মিনিটে ডেলিভারি”, সেটি এখন “৩০,০০০+ পণ্য আপনার দোরগোড়ায়” হয়ে গেছে। অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলিও এই পরিবর্তনের পথে রয়েছে। কোম্পানিগুলি সরকারকে আশ্বাস দিয়েছে যে, তারা বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অ্যাপ থেকে সময়-নির্ভর দাবি সরিয়ে ফেলবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ডেলিভারি সম্পূর্ণ ধীর হয়ে যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি অব্যাহত থাকবে, কারণ ‘ডার্ক স্টোর’ (ছোট গুদাম) শহরের বিভিন্ন অংশে স্থাপিত থাকায় দ্রুত সরবরাহ সম্ভব।এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে গিগ ওয়ার্কারদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন। ২০২৫-এর শেষের দিকে, বিশেষ করে নববর্ষের আগের দিন (৩১ ডিসেম্বর) এবং জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি ডেলিভারি রাইডার ধর্মঘট করেন। তারা ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, দুর্ঘটনা বীমা এবং অবাস্তব ‘১০ মিনিট’ টার্গেট বন্ধের দাবি তুলেছিলেন। টেলাঙ্গানা গিগ অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (TGPWU) এবং ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ-বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স (IFAT)-এর মতো সংগঠন এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা বলেছেন, এই অসম্ভব সময়সীমা পূরণ করতে গিয়ে রাইডাররা অসতর্কভাবে বাইক চালান, যা দুর্ঘটনার কারণ হয়।
রাজ্যসভার সাংসদ রাঘব চাড্ডা এই বিষয়টি বারবার তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, রাইডারদের টি-শার্ট, ব্যাগে এবং অ্যাপে কাউন্টডাউন দেখে চাপ সত্যিই বাড়ে। তিনি কেন্দ্রের এই হস্তক্ষেপকে “সময়োপযোগী, সিদ্ধান্তমূলক এবং সহানুভূতিশীল” বলে অভিহিত করেছেন।কুইক কমার্স ভারতের ই-কমার্সের একটি দ্রুতবর্ধনশীল অংশ। ২০২৫ সালে এর বাজার ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। শহরের কাছাকাছি ‘ডার্ক স্টোর’ এবং প্রচুর রাইডার নিয়োগ করে এই দ্রুততা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মডেলে গিগ ওয়ার্কারদের (ভারতে প্রায় ৭৭ লক্ষ, ২০৩০ সালে ২.৩৫ কোটি হবে) কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।এই পরিবর্তনকে অনেকে “অপটিক্স-চালিত” বললেও, এটি খাতের পরিপক্কতার লক্ষণ। গ্রাহকরা জরিপে বলেছেন, ১০ মিনিট না হলেও ২০-৩০ মিনিটে ডেলিভারি হলেই চলবে। সুরক্ষা ও ন্যায্যতা এখন অগ্রাধিকার।এই পদক্ষেপ ভারতের গিগ ইকোনমির ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করছে— যেখানে প্রযুক্তি ও ব্যবসার সঙ্গে মানবিকতা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

