নয়াদিল্লি, ১৬ জুলাই: লাদাখের খ্যাতনামা পরিবেশ আন্দোলনকারী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশন ঘিরে তৈরি হওয়া গভীর উদ্বেগ এবার পৌঁছাল দেশের বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ অলিন্দে। গত ২৮ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশনে বসেছেন এই সমাজকর্মী। দীর্ঘ ১৮ দিনেরও বেশি সময় অন্নহীন থাকায় তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছে। এই প্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) পরিপ্রক্ষিতে আজ দিল্লি হাইকোর্ট অত্যন্ত কড়া ও মানবিক অবস্থান গ্রহণ করল। বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, “যে কোনো নাগরিকের জীবনই অমূল্য”। একই সঙ্গে আদালত কেন্দ্র এবং দিল্লি সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, অবিলম্বে প্রতিদিন নিয়মিত চিকিৎসকদের দিয়ে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, সোনম ওয়াংচুকের দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে আদালতে একটি জরুরি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে অবিলম্বে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আর্জি জানানো হয়। প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত নাগরিকের জীবনের অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। শুনানি চলাকালীন বেঞ্চ মন্তব্য করে, অনশনরত কোনো আন্দোলনকারীর জীবন বিপন্ন হতে দেওয়া যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনো নাগরিকের জীবনের সুরক্ষায় প্রশাসনকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। হাইকোর্টের এই বেঞ্চ অবিলম্বে সরকারি চিকিৎসকদের একটি দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে, যারা প্রতিদিন ক্লিনিকে বা অনশনস্থলে গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
আদালতের এই কড়া অবস্থানের পর সরকারের পক্ষে দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা শুনানিতে অংশ নেন। তিনি আদালতকে আশ্বস্ত করে জানান যে, সরকার এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের সমস্ত নির্দেশিকা ও পর্যবেক্ষণ মেনে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন এবং জানান যে, চিকিৎসকদের পরামর্শ ও রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতি রোধে সমস্ত রকম জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা বা প্রয়োজনে হাসপাতালে স্থানান্তরের পদক্ষেপ করতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সরকারি এই আশ্বাসের বিষয়টি আদালত নথিবদ্ধ করে এবং এই মামলার নিষ্পত্তি ঘটায়। তবে এর পাশাপাশি ওয়াংচুকের অনশনস্থলে সার্বক্ষণিক একটি চিকিৎসকদের দল ও প্রয়োজনীয় লাইফ-সাপোর্ট পরিকাঠামো মজুত রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, লাদাখের বিশেষ সাংবিধানিক রক্ষাকবচ ও ষষ্ঠ তপশিলের (Sixth Schedule) মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছেন সোনম ওয়াংচুক। নিজের অঞ্চলের পরিবেশ ও সংস্কৃতি রক্ষায় এর আগেও তিনি একাধিকবার দীর্ঘমেয়াদি অনশন করেছেন। তবে গত ২৮ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই অনশন তাঁর আগের সমস্ত আন্দোলনের চেয়েও মারাত্মক রূপ নিয়েছে, কারণ ইতিমধ্যেই ১৮ দিন পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁর শরীর চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পেশী ক্ষয়ের মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিয়েছে বলে চিকিৎসকদের বুলেটিনে জানানো হয়েছে। এই আন্দোলনের তীব্রতা ও ওয়াংচুকের শারীরিক পরিস্থিতি সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি হাইকোর্টের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনেছে, কারণ আদালতের নজরদারির ফলে এখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো উদাসীনতা দেখানোর সুযোগ থাকবে না।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
