নয়াদিল্লি, ১৬ জুলাই: পরীক্ষা ব্যবস্থায় কারচুপি এবং প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ালেন প্রবীণ কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর। একই সঙ্গে এই আন্দোলনে শামিল হয়ে আমরণ অনশনরত বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও সমাজ সংস্কারক সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের আন্তরিক আবেদন জানিয়েছেন তিরুবনন্তপুরমের এই সাংসদ। বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (পূর্বতন টুইটার)-এ পোস্ট করা একটি খোলা চিঠিতে থারুর আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ যুবপ্রজন্মের এই লড়াইয়ে তাঁরা একা নন, সমগ্র দেশ তাঁদের পাশে রয়েছে। আগামী সোমবার থেকে সংসদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হতে চলায় এই জ্বলন্ত সমস্যাটি দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক ফোরামে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
যন্তর মন্তরে নিট (NEET) সহ অন্যান্য সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেনিয়মের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র নেতৃত্বে গত ২৫ দিন ধরে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনেই গত ২৮ জুন থেকে শামিল হয়ে অনশন শুরু করেন লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ইতিমধ্যেই তাঁর অনশন ১৮ দিনে পদার্পণ করেছে এবং তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও পেশীর ক্ষয়ের কারণে তাঁর স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে থারুর তাঁর খোলা চিঠিতে লিখেছেন, “শ্রদ্ধেয় সোনম ওয়াংচুক-জি-র কাছে আমার আন্তরিক আবেদন— দয়া করে আপনার অনশন ভাঙুন। আপনি এই গোটা দেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন, অনশনের মূল উদ্দেশ্য তো এটাই। আগামী দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য ভারতের আপনার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত প্রয়োজন”। থারুর আরও যোগ করেন যে, আমরণ অনশন না করে এই সমস্যার সমাধান খোঁজা উচিত সংসদে। কারণ আগামী সোমবার থেকে সংসদ চালু হলে সেখানে পড়ুয়াদের এই দুর্ভোগ ও ক্ষোভের কথা আইনপ্রণেতারা তুলে ধরতে পারবেন।
আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ‘প্রিয় তরুণ বন্ধু’ সম্বোধন করে শশী থারুর স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি একজন রাজনীতিবিদ বা সাংসদ হিসেবে এই চিঠি লিখছেন না, বরং ভারতীয় যুবপ্রজন্মের বর্তমান সংকট দেখে গভীরভাবে ব্যথিত একজন নাগরিক হিসেবে লিখছেন। নিজের মধ্যবিত্ত পরিবারের লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি নিজে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি। যোগ্যতার ভিত্তিতে পরীক্ষা, স্বচ্ছ ফলাফল এবং স্কলারশিপই ছিল আমাদের মতো পরিবারের সন্তানদের স্বপ্নপূরণের একমাত্র উপায়”।
তিনি ক্ষোভের সাথে জানান যে, যখন এই পরীক্ষা ব্যবস্থার সিঁড়িটি ভেঙে ফেলা হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় এবং পরীক্ষা বাতিল করা হয়, তখন ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তারা বিকল্প উপায়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন এবং তাঁদের মা-বাবার ত্যাগ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আন্দোলনরতদের বার্তা দিয়ে থারুর বলেন, “আপনাদের এই রাগ কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনুশাসনহীনতা নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের গভীর যন্ত্রণা, যারা সব নিয়ম মেনে চলেও শেষ পর্যন্ত প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছে”।
দেশের সরকারকে এই সংকটের দিনে একরোখা মনোভাব ত্যাগ করে আলোচনার রাস্তায় হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন শশী থারুর। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনকে উপেক্ষা না করে কেন্দ্রের উচিত অবিলম্বে পড়ুয়াদের সাথে টেবিলে বসা। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের তরুণ নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং এটিই হলো প্রকৃত দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ”।
উল্লেখ্য, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ইতিপূর্বেই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, শিবসেনা (ইউবিটি) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহ একাধিক বিরোধী নেতা তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। এমনকী দিল্লি হাইকোর্টে ওয়াংচুককে জোরপূর্বক খাওয়ানোর আবেদন জানিয়ে একটি পিটিশনও দাখিল করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে থারুরের এই খোলা চিঠি দিল্লির আন্দোলনের পারদ এবং রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বাংলার সব খবর ও টাটকা আপডেট পেতে বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
