কেন্দ্রীয় সরকার জিডিপির তথ্য কারসাজি করেছে বলে অভিযোগ করছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সুভাষ

কেন্দ্রীয় সরকার জিডিপির তথ্য কারসাজি করেছে বলে অভিযোগ করছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সুভাষ

নয়াদিল্লি, ২ সেপ্টেম্বর:

ভারতের সরকারি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপানউতোর। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সরকারের এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থ ও অর্থনৈতিক বিষয়ক সচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। তাঁর দাবি, তথ্যের কারিগরি পরিবর্তন ও নিম্নমুখী সংশোধনের কারণে বৃদ্ধির এই হারটি কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

সুভাষচন্দ্র গর্গ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির দাবি অনুযায়ী, ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির এই হারটি মূলত অতীতের পরিসংখ্যানের নিম্নমুখী সংশোধনের কারণে তৈরি হওয়া কম ভিত্তিমূল্যের প্রভাব বা লো বেস এফেক্টের ফল। সমালোচকদের বক্তব্য, গত বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের চলতি মূল্যের নামমাত্র জিডিপি হিসাবটি নিম্নমুখী সংশোধন করা হয়েছে। গর্গের গণনা অনুযায়ী, বর্তমান প্রথম ত্রৈমাসিকের মোট উৎপাদন যদি পূর্বের অপরিবর্তিত ভিত্তিমূল্যের সঙ্গে তুলনা করা হতো, তবে বৃদ্ধির প্রকৃত গাণিতিক হার দাঁড়াত মাত্র ২.৬ শতাংশের কাছাকাছি।

সরকারি বৃদ্ধির তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন মুখ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রণব সেন এবং একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষকও। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র এবং অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড বা জিভিএ-র সঙ্গে জিডিপির ব্যাপক ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ ও প্রকৃত মজুরির স্থবিরতা, দুর্বল ব্যক্তিগত ভোগব্যয় এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের ক্রমহ্রাসমান হারের কারণে প্রায় আট শতাংশের এই উচ্চ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে গবেষকেরা ইঙ্গিত করেছেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই কারচুপির অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল-সহ সরকারি নীতি নির্ধারকেরা জানিয়েছেন, সরকারি এই তথ্য সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক। সরকারি পক্ষের যুক্তি, উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী, সেখানে প্রকৃত বৃদ্ধির হার ২.৬ শতাংশ হওয়া বাস্তবে অসম্ভব। রেকর্ড পরিমাণ জিএসটি সংগ্রহ, ইউপিআই লেনদেনের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের ২০ থেকে ২২ শতাংশ সম্প্রসারণ এবং ১০.৩ শতাংশ নামমাত্র জিডিপি বৃদ্ধি এই তথ্যের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলিও ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ চলতি অর্থবর্ষে ভারতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭.২ থেকে ৭.৩ শতাংশ করেছে। তারা জানিয়েছে, কিছু পদ্ধতিগত সংস্কারের অবকাশ থাকলেও ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। তথ্যের ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল্যের প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের তথ্যের ফারাককে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক আপাতত দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে।শ

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply