উত্তর-পূর্ব দিল্লির সীমানায় মহিলাদের স্কিল সেন্টারে উগ্র হিন্দুত্ববাদী তাণ্ডব, বন্ধের হুমকি

উত্তর-পূর্ব দিল্লির সীমানায় মহিলাদের স্কিল সেন্টারে উগ্র হিন্দুত্ববাদী তাণ্ডব, বন্ধের হুমকি

নয়াদিল্লি, ১৩ সেপ্টেম্বর:

উত্তর-পূর্ব দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের লোনি লালবাগ এলাকায় মহিলাদের জন্য পরিচালিত একটি নিখরচায় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জোরপূর্বক ঢুকে চরম তাণ্ডব চালিয়েছে একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদী। প্রতিষ্ঠানটিকে বেআইনি মাদ্রাসা আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা বন্ধ করে দেওয়ার কড়া হুমকি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়ের নেতৃত্বে এই হামলা সংঘটিত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে পাঠরত হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রীদের মধ্যে।

লোনির লালবাগে ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টার নামে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মহম্মদ দানিশ।২০২২ সালে অসুস্থতার কারণে তাঁর স্ত্রী ফারহার অকালমৃত্যু হয়।উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁর স্ত্রীকে বহু পথ পেরিয়ে পড়তে যেতে হয়েছিল।সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং এলাকার পিছিয়ে পড়া মহিলাদের স্বনির্ভর করতে গত মে মাস থেকে দানিশ এই কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চালু করেন।সেখানে সেলাই, মেহেন্দি নকশা, নার্সিং প্রশিক্ষণ, ক্যালিগ্রাফি, স্পোকেন ইংলিশ ও কম্পিউটারের কাজ শেখানো হয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর আচমকা প্রায় একশো জন যুবকের একটি দল সেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চড়াও হয়।অভিযোগ, স্থানীয় বিজেপি কাউন্সিলর সুনীতা সোমের আত্মীয় রাজেশ সোমের নেতৃত্বে সেই দল ভেতরে প্রবেশ করে।উপস্থিত নারী শিক্ষার্থীদের সামনে তারা অশালীন মন্তব্য করে এবং কেন্দ্রটি বন্ধ করার দাবি তোলে। হামলাকারীরা স্পষ্ট ভাষায় হুমকি দিয়ে বলে যে এখানে কোনো শিক্ষাদান চলতে দেওয়া হবে না। এর পর দিন অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফের কেন্দ্রের বাইরে ভিড় জমিয়ে একই ধরনের উগ্র স্লোগান ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়।

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে দানিশ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে তাঁকে উল্টে ধমক দিয়ে বলা হয় যে সেখানে কোনো অবস্থাতেই মাদ্রাসা চলতে দেওয়া হবে না এবং কেন্দ্রটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এর পর দিনই অভিযোগের সূত্র ধরে পুলিশ কর্মীরা সেন্টারে পৌঁছে দানিশের বৈধ নথিপত্র, রেজিস্ট্রেশন ও আর্থিক হিসেব খতিয়ে দেখতে শুরু করে।দানিশ পুলিশ ফাঁড়িতে লিখিত অভিযোগ এবং সরকারি জনশুনওয়াই পোর্টালে অনলাইন অভিযোগ দায়ের করেছেন, যেখানে রাজেশ সোমের নাম সরাসরি অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে এই দলটির সঙ্গে কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দল যোগ দিয়ে অপপ্রচার শুরু করে এবং দাবি তোলে যে এলাকায় গোপনে একটি বেআইনি মাদ্রাসা চালানো হচ্ছে। তবে ধর্মীয় বিভেদ তৈরির এই চেষ্টার মুখে প্রতিষ্ঠানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আশপাশের হিন্দু প্রতিবেশীরা। সীমা ও আকাশ সিংয়ের মতো স্থানীয় বাসিন্দারা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন যে এটি কোনোভাবেই মাদ্রাসা নয়, বরং নারীদের স্বনির্ভর করার একটি মহৎ উদ্যোগ। তাঁরা স্পষ্ট জানান, সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক স্বার্থে এমন ভালো উদ্যোগকে কোনোভাবেই বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।

সেন্টারের আঠারো বছর বয়সী হিন্দু ছাত্রী আনশিকা সিং জানান, তিনি জুন মাস থেকে সেখানে কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।উগ্র গোষ্ঠী তাঁর বাড়িতে ফোন করে সেখানে না পাঠানোর জন্য পরিবারকে চাপ সৃষ্টি করলেও তাঁর পরিবার এই অপপ্রচারে কান দেয়নি। সমিনা বেগমের মতো বহু নারী সেখান থেকে কাজ শিখে ইতিমধ্যেই পোশাক তৈরির বরাত পেয়ে আর্থিক উপার্জনের পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল, সেখানে হঠাৎ করেই উগ্রপন্থীদের এমন অপতৎপরতায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply