নদিয়ায় একই জমি ঘিরে বিবাদে দুই বিজেপি বিধায়ক, পৌঁছল মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে

নদিয়ায় একই জমি ঘিরে বিবাদে দুই বিজেপি বিধায়ক, পৌঁছল মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে

চাকদহ, ৫ সেপ্টেম্বর:

একই জেলার দুই বিজেপি বিধায়কের মধ্যে জমি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সংঘাত। ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনও টানাপোড়েন না থাকলেও নদিয়ার চাকদহ থানা এলাকার ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে থাকা মূল্যবান জমিকে ঘিরে হরিণঘাটার বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার এবং রানাঘাট দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অসীম কুমার বিশ্বাসের মধ্যে মালিকানা সংক্রান্ত বিতর্ক প্রকাশ্যে চলে এসেছে। একাধিক দফায় দলীয় ও প্রশাসনিক আলোচনার পরেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দুই বিধায়কের দাবি অনুযায়ী বিষয়টি ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচরে আনা হয়েছে।

নদিয়ার চাকদহ থানার শিমুরালির নরপতিপাড়া মৌজায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত ওই বিতর্কিত জমি। জানা গিয়েছে, প্রায় ৩২ শতক জমির একেবারে মাঝখানে থাকা ১১ শতক জমিকে ঘিরেই মূল বিরোধ। জমিটি ৮৯০ নম্বর খতিয়ানের অন্তর্গত। কল্যাণী সংলগ্ন এই অঞ্চলে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর তৈরির সম্ভাবনা এবং জাতীয় সড়কের সম্প্রসারণের কারণে জমির দাম অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই অংশের মালিকানা ঘিরে দুই পক্ষের লড়াই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

রানাঘাট দক্ষিণের বিধায়ক অসীম কুমার বিশ্বাসের দাবি, বিতর্কিত ১১ শতক জমি তিনি ২০২১ সালেই নিয়ম মেনে কিনেছেন। যাবতীয় রেকর্ড এবং চেন ডিড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেই সেই সময় জমি কেনা হয়েছিল এবং তাঁর কাছে জমি ক্রয়ের সমস্ত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। তাঁর কথায়, দলীয় সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, বিবাদ কেবল ওই জমিকে ঘিরে। তাঁর কেনা দলিল আসল না অন্য কারও দলিল ভুয়ো, তা আদালতের বিচারেই প্রমাণিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, রাজনৈতিক আলোচনার বদলে বিএলআরও দপ্তরের নথি খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত সত্য জানা সম্ভব।

পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছেন হরিণঘাটার বিধায়ক অসীম সরকার। তাঁর দাবি, জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা রানি দত্ত, যিনি ১৯৮৯ সালে আবুল হোসেন তরফদারের কাছে তা বিক্রি করেছিলেন। পরে আবুল হোসেন জমিটি চাষ করতেন এবং তাঁর নামে কিছু অংশ বর্গা হিসেবেও নথিভুক্ত ছিল। আবুল হোসেন পরবর্তীকালে অশোক বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তিকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিলেও তিন মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যুর ফলে সেই পাওয়ারনামা আইনত বাতিল হয়ে যায়। এর পর আবুল হোসেনের তিন সন্তান জমিটির বিষয়ে অসীম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

অসীম সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্ত কাগজপত্র যাচাই করেন এবং গত ২৫ অগস্ট কল্যাণীতে রেজিস্ট্রি করে মোট ৩২ শতক জমি কেনেন। তবে তাঁর অভিযোগ, রেজিস্ট্রির দিনই অসীম কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল লোক এসে প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের তরফেও ওই ১১ শতক জমি নিয়ে বিবাদে না জড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং যাঁরা আগে জমি বিক্রি করেছিলেন তাঁদের ৩৬ লক্ষ টাকা ফেরানোর বিষয় নিয়েও কথা হয়। তিনি এও অভিযোগ করেন যে, বিষয়টি জানার পরেও অসীম কুমার বিশ্বাস কৃষ্ণনগরে গিয়ে নতুন করে ওই জমি রেজিস্ট্রি করিয়েছেন। তবে অসীম কুমার বিশ্বাস একজন সহজ-সরল মানুষ এবং কেউ তাঁকে ভুল বুঝিয়ে এই কাজ করিয়েছে বলেই অসীম সরকারের মত।

এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অসীম কুমার বিশ্বাস। তাঁর প্রশ্ন, ২০২১ সালে তিনি আগেই ওই জমি কিনে নেওয়ার পর জেনেশুনে অসীম সরকার কেন পরবর্তীকালে সেই জমি কিনতে গেলেন। তাঁর মতে, গোটা বিষয়টি মূলত পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিতর্ক কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় সড়কের ধারে ৩২ শতক জমিতে দুই বিধায়কের নামেই পৃথক দুটি সাইনবোর্ড ঝুলছে, যা পথচলতি মানুষের নজরে আসছে। দ্রুত জমি মাফিয়াদের প্রভাব ও মূল্যবৃদ্ধির আবহে ৩২ শতকের মধ্যে থাকা সেই বিতর্কিত ১১ শতকের প্রকৃত মালিক কে, তা নিয়ে প্রশ্ন জারি রয়েছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply