কলকাতা, ৫ সেপ্টেম্বর:
ফরাক্কার কাছে রেললাইনে ধসের কারণে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বহু ট্রেন ঘুরপথে চালানো হচ্ছে। এর জেরে একাধিক দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছচ্ছে। তেমনই শিয়ালদহগামী প্রিমিয়াম ট্রেন দার্জিলিং মেল নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় আট ঘণ্টা দেরিতে চলছিল। পথ পরিবর্তনের কারণে মালদহের পর ট্রেনটির আর কোথাও নির্ধারিত স্টপেজ ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ট্রেনের কামরায় থাকা এক ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে দুধ তুলে দিতে নৈহাটি স্টেশনে জরুরি সংকেত দিয়ে দাঁড় করানো হল এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, এক মহিলা তাঁর কোলের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কিশনগঞ্জ স্টেশন থেকে দার্জিলিং মেলের এ২ কামরায় ওঠেন। তাঁর আসনটি ছিল ৩৫ নম্বর সাইড লোয়ার বার্থে। পরিকল্পনা ছিল যে মালদহ স্টেশনের পর কোনও একটি স্টেশনে তাঁর আত্মীয়ের মাধ্যমে শিশুর জন্য দুধ পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু রেললাইনের সমস্যার কারণে ট্রেনটি মালদহ থেকেই ঘুরপথে পরিচালিত হয়। ফলে পূর্বপরিকল্পিত স্টেশনে আত্মীয়ের মাধ্যমে খাবার পৌঁছনোর আর কোনও সুযোগ ছিল না।
দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন চলায় এবং পথ পরিবর্তনের কারণে আটকে পড়ে দুধের অভাবে ট্রেনের ভেতরেই কান্নাকাটি শুরু করে একরত্তি শিশুটি। চরম বিপাকে পড়ে ট্রেনের ভেতর থেকেই উত্তরপ্রদেশে থাকা তাঁর স্বামী আজগর আলিকে ফোনে সার্বিক পরিস্থিতি জানান ওই মহিলা যাত্রী। স্ত্রীর কাছ থেকে সমস্যার কথা জানতে পেরে আজগর আলি দ্রুত রেলের সহায়তা সংক্রান্ত রেল মদত অ্যাপে একটি জরুরি আবেদন নথিভুক্ত করেন। তিনি আবেদনে স্পষ্ট জানান যে ঘুরপথে চলার কারণে শিশুর দুধের সংস্থান করা যাচ্ছে না, তাই মানবিক কারণে রেল কর্তৃপক্ষ যেন দুধের বন্দোবস্ত করে।
বিষয়টি শিয়ালদহের কমার্শিয়াল কন্ট্রোল বিভাগের কাছে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজারের নজরে আনা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে রেলের তরফে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়। ট্রেনটি ব্যান্ডেল স্টেশনে পৌঁছলে রেলকর্মীরা কামরায় গিয়ে ওই মহিলা যাত্রীকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে ভিড়ের কারণে সেখানে তাঁকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
এরপর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে ট্রেনটি নৈহাটি স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসতেই রেলকর্মীরা জরুরি সংকেতের ব্যবস্থা করেন। সাধারণত দার্জিলিং মেলের মতো সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ট্রেনের নৈহাটিতে কোনও নির্ধারিত স্টপেজ থাকে না। তা সত্ত্বেও বিশেষ জরুরি সিগন্যাল দেখিয়ে ট্রেনটিকে প্ল্যাটফর্মে থামানো হয়। ট্রেনটি থামার পর রেলকর্মীরা কামরায় ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে এ২ কোচের ৩৫ নম্বর বার্থে থাকা ওই মহিলাকে শনাক্ত করেন এবং শিশুর জন্য আনা দুধের বোতল তাঁর হাতে তুলে দেন।
দুধ পাওয়ার পরেই শিশুর কান্না থামে এবং স্বস্তি ফিরে পান অসহায় মা। উত্তরপ্রদেশ থেকে ফোনে আজগর আলি জানান যে অপ্রত্যাশিত রুট পরিবর্তনের ফলে তাঁর পরিবার সমস্যায় পড়েছিল, তবে রেল মদতে আবেদন করার পরই রেল কর্তৃপক্ষ যেভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে শিশুর কাছে দুধ পৌঁছে দিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। তিনি রেলের এই মানবিক ভূমিকার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। শেষ পর্যন্ত প্রায় আট ঘণ্টা দেরিতে শুক্রবার দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছায়।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

