শ্রীনগর, ২৫ জুলাই: বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ)-এর অধীনে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর অবশেষে জামিনে মুক্তি পেলেন বিশিষ্ট কাশ্মীরি মানবাধিকার কর্মী খুররম পারভেজ এবং প্রথমার্ধের সাংবাদিক ইরফান মেহরাজ। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র দায়ের করা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের (টেরর ফান্ডিং) একটি মামলায় দীর্ঘ চার বছর জেল খাটছিলেন পারভেজ। অন্যদিকে, একই অভিযোগে প্রায় আড়াই বছর ধরে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন সাংবাদিক মেহরাজ। দিল্লির বিশেষ এনআইএ আদালত সম্প্রতি তাঁদের দু’জনকেই জামিন প্রদান করে। তবে জামিন পেলেও এই মামলার মূল বিচারপ্রক্রিয়া বা ট্রায়াল আগের মতোই বহাল থাকবে বলে আদালতের নির্দেশে জানানো হয়েছে।
কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্তকরণের কাজে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন খুররম পারভেজ। তিনি ‘এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেয়েনস্ট ইনভলান্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ (এএফএডি)-এর চেয়ারপার্সন এবং ‘জাজু অ্যান্ড কাশ্মীর সিভিল সোসাইটি’ (জেকেসিসিএস)-এর অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী। ২০০৬ সাল থেকে তিনি কাশ্মীরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও বেসামরিক নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননাও পেয়েছেন। অন্যদিকে, ইরফান মেহরাজ ছিলেন কাশ্মীরের একজন স্বাধীন সাংবাদিক, যিনি ‘ডয়চে ভেলে’ (ডিডব্লিউ)-সহ একাধিক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় ফ্রিল্যান্স কাজ করতেন।
তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র দাবি, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের আড়ালে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিদেশ থেকে অর্থ আনা হতো। সেই অর্থ অনিয়ম করে বিভিন্ন হিংসাত্মক কাজে ব্যবহার করার অভিযোগে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে খুররম পারভেজকে তাঁর শ্রীনগরের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় সংস্থাটি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে এই একই সংক্রান্ত মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় সাংবাদিক ইরফান মেহরাজকে।
এনআইএ-র চার্জশিটে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, অভিযুক্তরা তথ্য সংগ্রহের নামে উপত্যকার সুরক্ষার ওপর আঘাত হানছিলেন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছিলেন। তবে অভিযুক্তদের আইনজীবী ও পরিবার প্রথম থেকেই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে এসেছিলেন যে, পারভেজ এবং মেহরাজ কেবল সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে মানবাধিকার রক্ষা এবং নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার কাজ করছিলেন।
খুররম পারভেজ ও ইরফান মেহরাজের টানা কারাবাস আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি (ইউএন স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার), ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’, এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর মতো একাধিক শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারত সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছিল। তারা বারবার দাবি জানিয়েছিল যে, জামিন অযোগ্য আইনি ধারা প্রয়োগ করে কণ্ঠরোধ করার মানসিকতা বন্ধ করে তাঁদের দ্রুত নিষ্কৃতি দেওয়া হোক।
আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে বিশেষ এনআইএ বিচারক তাঁদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, বর্তমানে তদন্ত শেষ হয়ে চার্জশিট গঠন করা হয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া চলতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কাউকে জেলে আটকে রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়। কিছু নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তাঁদের জামিন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ না করা এবং তদন্তের কাজে সহযোগিতা প্রদান করা।
দীর্ঘদিন পর পারভেজ ও মেহরাজের মুক্তির খবরে তাঁদের পরিবার এবং কাশ্মীরের সামাজিক ও সাংবাদিক মহলে বড়সড় স্বস্তির হাওয়া দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে মুক্ত গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য সোচ্চার থাকা বিভিন্ন মহল আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কেবল জামিন পাওয়ার মাধ্যমে মামলা শেষ হয়ে যায় না। ট্রায়াল কোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা ইউএপিএ সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগগুলির আইনি শুনানি অব্যাহত থাকবে। সেখানে তাঁদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়াই হবে মূল আইনি চ্যালেঞ্জ।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
