নয়াদিল্লি, ১৬ জুলাই: স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে বিগত ৭০ বছরে যা কখনও ঘটেনি, এবার তা-ই করে দেখাল নরেন্দ্র মোদী সরকার! এই প্রথম কোনও বেসরকারি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী বা কালোবাজারি নয়, খোদ দেশের সরকারই প্রকাশ্য দিবালোকে নাগরিকদের কাছে ‘ভেজাল’ পেট্রোল বিক্রি করছে। এমনই এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক অভিযোগ এনে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন প্রখ্যাত ভোজপুরী লোকসঙ্গীতশিল্পী তথা সমাজকর্মী নেহা সিং রাঠোর। তাঁর এই মারাত্মক অভিযোগের পর সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
অতীতে পেট্রোলে ভেজাল মেশানোর দায়ে যেখানে বেসরকারি ব্যবসায়ী বা পাম্প মালিকদের সোজা শ্রীঘরে যেতে হতো, সেখানে আজ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির মাধ্যমে সরকার নিজেই সেই কাজ করছে বলে দাবি করেছেন নেহা। এই পোস্টের সাথে তিনি একটি ভিডিও-ও যুক্ত করেছেন, যা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।
নেহা সিং রাঠোরের শেয়ার করা ওই ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, এক মেকানিক একটি মোটরবাইকের ফুয়েল কম্পোনেন্ট বা জ্বালানি ট্যাঙ্ক এবং ইঞ্জিনের অংশগুলি একে একে খুলছেন। যন্ত্রাংশগুলি খুলতেই বেরিয়ে আসছে শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য। দেখা যাচ্ছে, বাইকের ফুয়েল লাইনের ভেতরে সাদা, মোমের মতো ঘন আস্তরণ জমে রয়েছে এবং তার সাথে মিশে আছে প্রচুর নোংরা ও আবর্জনা।
ওই মেকানিকের দাবি, নিম্নমানের এবং অতিরিক্ত ভেজালযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের ফলেই ইঞ্জিনের এই দশা হয়েছে। এই আস্তরণ ইঞ্জিনের ভেতরে জ্বালানি চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে গাড়িটি মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। নেহা এই ভিডিওটিকে সরকারের ‘ভেজাল পেট্রোল’ বিক্রির প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
হঠাৎ কেন জ্বালানির এই ভয়াবহ গুণগত পতন? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সাম্প্রতিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি। গত এপ্রিল ২০২৬-এ ভারত সরকার দেশজুড়ে পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ (E20 Ethanol Blending) বাধ্যতামূলক করেছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং অপরিশোধিত তেল আমদানির খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে এই পদক্ষেপ করা হলেও, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা একেবারেই সুখকর হচ্ছে না। বহু বছর পুরোনো গাড়ি বা বাইকগুলি এই E20 জ্বালানির সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, যার ফলে ইঞ্জিনের ভেতরে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় এই ধরনের সাদা মোমের মতো আস্তরণ জমছে।
এরই পাশাপাশি, গত জুন ২০২৬-এ পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) তৈরি হওয়া চরম ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে ভারতসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড়সড় ধাক্কা লাগে। তেল আমদানির এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে এবং দেশের ভেতরের জোগান স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে জ্বালানির গুণগত মানের সাথে আপস করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আমজনতার মনে তীব্র ক্ষোভ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরেই সারা দেশ থেকে বাইক ও গাড়ির পারফরম্যান্স খারাপ হওয়া এবং মাঝরাস্তায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার অজস্র অভিযোগ জমা পড়ছিল। নেহা সিং রাঠোরের পোস্ট যেন সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বারুদ ছিটাল।
নেহা সিং রাঠোর তাঁর পোস্টে স্পষ্ট লিখেছেন, ভারতের বিগত ৭০ বছরের ইতিহাসে যখনই পেট্রোলে ভেজাল দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে, প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে। ভেজালকারীরা জেল খেটেছে। কিন্তু বর্তমান জমানায় খোদ সরকারই যখন নীতিগতভাবে জ্বালানির রূপ বদলে দিচ্ছে এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের লক্ষাধিক টাকার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন এর দায় কে নেবে? যেখানে সাধারণ মানুষ চড়া ট্যাক্স দিয়ে পেট্রোল কিনছেন, সেখানে এই ধরনের নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহকে ‘আইনি ভেজাল’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়, এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশজুড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
