গুরুগ্রাম, ১৪ জুলাই ২০২৬: হরিয়ানার আইটি হাব গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৫-এর একটি পেয়িং গেস্ট (পিজি) আবাসনে ২৫ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ইনশারাহ আইয়ুবির রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সহকর্মী ও লিভ-ইন পার্টনার শ্রেষ্ঠ মালিক (২৫) রেললাইনে আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এই ঘটনা উত্তর ভারতে আন্তর্ধর্মীয় সম্পর্ক, নারী নিরাপত্তা এবং শহুরে যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
১২ জুলাই ২০২৬-এর রাতে ইনশারাহ আইয়ুবির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাঁরা নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পুলিশ মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৫-এর পিজিতে পৌঁছায়। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখা যায়, ঘরে রক্তের ছড়াছড়ি। ইনশারাহের দেহ মেঝেতে পড়ে আছে— শরীরে একাধিক ছুরির আঘাত এবং গলা কাটা অবস্থায়। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে জানা যায়, তিনি প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে খুন হয়েছেন।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, মাত্র তিন দিন আগে ইনশারাহ ও শ্রেষ্ঠ একসঙ্গে ওই পিজিতে থাকা শুরু করেছিলেন। ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে গড়ি রেল স্টেশনের কাছে রেললাইনে শ্রেষ্ঠ মালিকের দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর দেহ ট্রেনে কাটা অবস্থায় ছিল। মোবাইল ও অন্যান্য নথি থেকে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়। পুলিশের অনুমান, শ্রেষ্ঠ প্রথমে ইনশারাহকে খুন করে পালিয়ে যান এবং পরে আত্মহত্যা করেন।
ইনশারাহ আইয়ুবি উত্তরপ্রদেশের সীতাপুরের বাসিন্দা। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করে অপটাম (Optum)-এ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। তিনি জিডিএসসি লিড ছিলেন, ফ্রিল্যান্স ভয়েসওভার শিল্পী এবং পূর্ণস্ট্যাক ডেভেলপার হিসেবে পরিচিত। স্বপ্নভরা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল তাঁর।
অন্যদিকে শ্রেষ্ঠ মালিক ছত্তিশগড়ের ভিলাইয়ের বাসিন্দা। এনআইটি রায়পুরের ছাত্র ছিলেন, স্যামসাং-এ ইন্টার্নশিপ করেছেন এবং পরে অপটামে যোগ দেন। দুজনেই একই সংস্থায় কর্মরত ছিলেন।
এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং আধুনিক ভারতীয় শহরে যুবক-যুবতীদের সম্পর্ক, ধর্মীয়-সামাজিক বাধা এবং মানসিক চাপের এক জটিল ছবি তুলে ধরেছে। আন্তর্ধর্মীয় সম্পর্ক (ইন্টারফেথ) ভারতে বিতর্কিত বিষয়। একদিকে লিবারেল মহল এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ (এবং অন্যান্য সম্প্রদায়) এতে সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় পরিচয় হারানোর আশঙ্কা দেখেন।
ইনশারাহের ক্ষেত্রে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন— পারিবারিক সম্মতি ছাড়া লিভ-ইন সম্পর্ক কতটা নিরাপদ? শ্রেষ্ঠের আত্মহত্যা ইঙ্গিত দেয় যে ঘটনার পিছনে সম্ভবত ঝগড়া, ঈর্ষা বা মানসিক অস্থিরতা কাজ করেছে। পুলিশ এখন মোটিভ ও টাইমলাইন খতিয়ে দেখছে।
ভারতে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। শহুরে কর্মজীবী নারীরা স্বাধীনতা পেলেও, ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রায়ই ঝুঁকির সম্মুখীন হন। এই ঘটনা ‘লাভ জিহাদ’ বিতর্ককেও উস্কে দিয়েছে, যদিও পুলিশ এখনও কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যের প্রমাণ পায়নি। এটি মূলত একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ট্র্যাজেডি বলে মনে হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে এই ঘটনাকে ‘ইন্টারফেথ ফ্যান্টাসি’-র বিপদ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ শ্রেষ্ঠকে ‘দোষী’ বলে আক্রমণ করছেন।
পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিজিটাল প্রমাণ অপেক্ষিত।
ইনশারাহ আইয়ুবির মৃত্যু একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অকাল সমাপ্তি। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা ও ভালোবাসার সঙ্গে সতর্কতা ও সচেতনতাও জরুরি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— সকলের দায়িত্ব রয়েছে যুবসমাজকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
