~নিজাম পারভেজ
মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর (৬৩ নম্বর) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জুলফিকার আলি। কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে তিনি ৭৯ হাজার ৪২৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের আব্দুল সৌমিক হোসেনকে পরাজিত করেন। এই জয় কেবল একটি নির্দিষ্ট আসনের ফলাফল নয়; বরং মুর্শিদাবাদের এই মুসলিম-বহুল অঞ্চলে কংগ্রেসের ঐতিহাসিক প্রভাবকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার এক জোরালো বার্তা বহন করে।
পরিচিতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
৪২ বছর বয়সী জুলফিকার আলির বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার ইসলামপুর এলাকায়। পিতা হাবিবুর রহমানের সন্তান জুলফিকার পেশায় একজন ব্যবসায়ী এবং তিনি সরাসরি জনজীবন থেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলা নেই। ব্যবসা ও রাজনীতির মধ্যে সুচারুভাবে ভারসাম্য বজায় রাখাই তাঁর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
অধীর চৌধুরীর আদর্শে অনুপ্রাণিত এক নতুন নেতা
জুলফিকার আলির রাজনৈতিক যাত্রাটি খানিকটা অপ্রত্যাশিত। এবিপি আনন্দকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে তাঁর পরিবার ছোট থেকেই কংগ্রেস সমর্থক এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ। তবে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখেন নির্বাচনের মাত্র আট মাস আগে। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে দলীয় অফিস বন্ধ করে দেওয়া, কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং তোলাবাজির মতো ঘটনার প্রতিবাদেই তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি।
তিনি বিশ্বাস করেন, “স্রোতের উল্টোদিকে চলতে আমার ভালো লাগে।” শুরুতে অধীর চৌধুরী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনলেও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে চিনতেন না। পরবর্তীতে হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই তিনি দলীয় টিকিট পান এবং প্রথমবার প্রার্থী হয়েই দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে আনেন।

সাংগঠনিক দায়িত্ব ও দিল্লি সফর
২০২৬ সালের জুন মাসে কংগ্রেস তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস লেজিসলেটিভ পার্টির (WBPCL) নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে এবং ফারাক্কার মোতাব শেখকে তাঁর ডেপুটি করা হয়। রাজ্যে কংগ্রেসের মাত্র দুটি আসন জয়ের কঠিন পরিস্থিতিতে এই নেতৃত্ব বদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অধীর চৌধুরীর পথ ধরে তিনি রাজ্য কংগ্রেসকে নতুন রূপ দেওয়ার কাজে নেমে পড়েছেন। অধীরের সহায়তায় তিনি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাজ্য কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করেন।
রানিনগরের উন্নয়ন ও জাতীয় স্তরে অ্যাক্টিভিজম
রানিনগর বিধানসভার প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই জুলফিকার আলি এলাকার মৌলিক সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক মনোযোগ দিয়েছেন। গ্রামীণ এই কেন্দ্রে রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবিকার সংস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি রানিনগর-১ ব্লকের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করছেন। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার হওয়াকেই তিনি তাঁর প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য বলে মনে করেন।

তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি জাতীয় রাজধানীতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে গণতন্ত্র, সংবিধান ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে আয়োজিত এক প্রতিবাদ মিছিলে তিনি অংশ নেন। সেখানে অধীর রঞ্জন চৌধুরী এবং মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের মতো জাতীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া রাহুল গান্ধীর বাসভবনে আয়োজিত দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বৈঠকেও তিনি যোগ দেন। এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় জনসেবা ও জাতীয় স্তরের রাজনীতির মধ্যে এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে চলেছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসানের পর রাজ্য রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। জুলফিকার আলির মতো উদীয়মান নেতারা অধীর চৌধুরীর দীর্ঘ লড়াইয়ের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে দলকে পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রানিনগরবাসীর আস্থা অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন সাধারণ ব্যবসায়ী থেকেও নিবেদিতপ্রাণ জননেতা হয়ে ওঠা সম্ভব। ব্যবসা, পরিবার এবং রাজনীতির সুষম বিন্যাসের মধ্য দিয়ে দিল্লি পর্যন্ত তাঁর এই প্রতিবাদী যাত্রা পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
