পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রার্থনাসভায় হামলা, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের অভিযোগে একাধিক জেলায় আতঙ্ক

পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রার্থনাসভায় হামলা, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের অভিযোগে একাধিক জেলায় আতঙ্ক

কলকাতা, ৬ সেপ্টেম্বর:

পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের গৃহ-প্রার্থনাসভা এবং শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের অভিযোগ তুলে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতার মারধর, ভাঙচুর ও বাধার জেরে বহু এলাকায় ব্যক্তিগত প্রার্থনাসভা এবং ধর্মীয় যোগাযোগ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্থানীয় খ্রিস্টান সংগঠন ও ধর্মযাজকেরা। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক বিশদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৩ অগস্ট হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে রবিবার প্রার্থনার সময় মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটে।যাজক মিঠুন হাজরার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ জন নারী ও পুরুষ প্রার্থনার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। দুপুর নাগাদ স্লোগান দিতে দিতে একদল জনতা সেখানে জোর করে ঢুকে পড়ে এবং ধর্মান্তকরণের অভিযোগ তুলে উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর চড়াও হয়। অভিযুক্তরা সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, টেবিল ও অন্যান্য সামগ্রী ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ এসে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। এই ঘটনায় হাওড়া গ্রামীণ পুলিশ এফআইআর দায়ের করলেও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার অমিত বর্মা।

একই ধরনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে পূর্ব বর্ধমানের সাহানাগরে সেন্ট ক্ল্যারেট চার্চের অধীনস্থ এলাকায়।গত ১৪ অগস্ট এক নারীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালীন একদল ব্যক্তি সেখানে পৌঁছে কবরস্থানের জমির বৈধ কাগজপত্র দেখতে চায়। চার্চের পক্ষ থেকে নথিপত্র দেখানোর জন্য সময় চাওয়া হলেও তা শোনা হয়নি। অভিযোগ, মৃতের দেহ কবরে নামানোর পরেও তা জোর করে তুলে নেওয়া হয় এবং উপস্থিত শোকস্তব্ধ মানুষদের বাধা দেওয়া হয়। পরে দেহটি বর্ধমান শহরের অন্য একটি কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করতে হয়। জেলা পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তি স্থানীয় বাসিন্দা না হওয়ায় এবং জমির চরিত্র নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তির কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, যার নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কেবল উলুবেড়িয়া বা পূর্ব বর্ধমান নয়, হাওড়ার জগৎবল্লভপুর, ঘুসুড়ি, পূর্ব মেদিনীপুরের চেক মাইলপোস্ট এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ এলাকাতেও প্রার্থনাসভায় বাধার অভিযোগ সামনে এসেছে।ভারতীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা তথা বেঙ্গল ক্রিশ্চিয়ান কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক জানিয়েছেন, এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক আক্রমণের রূপ নিয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে ভুগছেন, যার কারণে বহু স্থানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থনাসভা স্থগিত রাখতে হয়েছে।

অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সিংহবাহিনীর সভাপতি দেবদত্ত মাজি এই জাতীয় প্রতিবাদের পক্ষে সওয়াল করে দাবি করেছেন, আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে বেআইনিভাবে ধর্মান্তকরণ করা হচ্ছে এবং তাঁরা এর বিরুদ্ধেই সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

গোটা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু। তিনি জানিয়েছেন, সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মপালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং সরকার কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করে না। তবে যদি কোথাও প্রলোভন দেখিয়ে বা জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে প্রশাসন আইনানুগ কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এদিকে বিরোধী দলগুলির একাংশ এই ধরনের ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা করেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply