হিঙ্গলগঞ্জ, ২৭ আগস্ট:
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহলের জন্য নতুন রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগে উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ঐতিহ্যবাহী ২৪৩ বছরের প্রাচীন হিঙ্গলগঞ্জ বাজারের প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী বর্তমানে জীবিকা এবং বাসস্থান হারানোর গভীর আশঙ্কায় দিন গুনছেন। সম্প্রতি সরকারি আধিকারিকরা এই এলাকায় জমি জরিপ ও পরিদর্শনের কাজ শুরু করতেই স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে হিঙ্গলগঞ্জ বাজার এই সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রুটিরুজির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই প্রাচীন বাজারটি। সম্প্রতি সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় অনুপ্রবেশ রোধ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার উদ্দেশ্যে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যাতায়াতের সুবিধার্থে রাস্তা তৈরির সরকারি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সুরক্ষার স্বার্থে নেওয়া এই প্রশাসনিক পদক্ষেপকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নীতিগতভাবে সমর্থন করলেও, তাদের মূল দুশ্চিন্তা বাজার এলাকার জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নেওয়া হলে বাজার এলাকার বহু মানুষের দোকান ও দীর্ঘদিনের বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ভাঙা পড়বে। এর ফলে আক্ষরিক অর্থেই পথে বসবেন কয়েকশো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী।
হিঙ্গলগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সুশান্ত ঘোষ জানিয়েছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা রাস্তা নির্মাণের বিরুদ্ধে তাদের কোনো ধরনের আপত্তি নেই। কিন্তু রাজ্য ও কেন্দ্র প্রশাসনের কাছে তাদের বিনীত আবেদন, বাজার-সংলগ্ন এই অত্যন্ত জনবহুল এলাকা থেকে যেন ন্যূনতম জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, জমির পরিমাণ সামান্য কমানো হলে বা সীমানার বিকল্প নকশা করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী বাজারটি রক্ষা পাবে এবং বহু মানুষের রুটিরুজি ও বাসস্থান অটুট থাকবে। পুরুষানুক্রমে ব্যবসা করে আসা এই মানুষগুলোর কাছে দোকানই আয়ের একমাত্র উৎস। সেই দোকান ভেঙে গেলে তাদের পরিবারগুলি চরম আর্থিক অনাহারের মুখে পড়বে।
এই আসন্ন বিপর্যয়ের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হিঙ্গলগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে দ্বারস্থ হয়েছেন আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা। নিজেদের বেঁচে থাকার দাবিদাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে তারা হিঙ্গলগঞ্জের বিডিও অফিস এবং হিঙ্গলগঞ্জ থানায় একটি লিখিত ডেপুটেশন জমা দিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করে তারা চাইছেন, জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থের সাথে যেন স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন, জীবিকা ও বাসস্থানের একটি সংবেদনশীল ও সুষ্ঠু সমন্বয় করা হয়।
বর্তমানে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্বিগ্ন চোখ প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। একদিকে জাতীয় সুরক্ষার কড়া পদক্ষেপ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও রুটিরুজির প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে ঐতিহ্যবাহী বাজার এবং ৪০০ পরিবারের জীবন শেষ পর্যন্ত প্রশাসন রক্ষা করতে পারে কি না, তা নিয়েই এখন হিঙ্গলগঞ্জ জুড়ে চরম উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

