বারুইপুর এনকাউন্টার ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র সংঘাত: এনকাউন্টারকে ‘ঐশ্বরিক বিচার’ বলল বিজেপি, ‘জঙ্গল রাজ’ তোপ তৃণমূলের

বারুইপুর এনকাউন্টার ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র সংঘাত: এনকাউন্টারকে ‘ঐশ্বরিক বিচার’ বলল বিজেপি, ‘জঙ্গল রাজ’ তোপ তৃণমূলের

বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা, ৮ জুলাই ২০২৬: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১২ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন ঝড় উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদল বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিজেপি যেখানে এই এনকাউন্টারকে “ঐশ্বরিক বিচার” এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর বার্তা হিসেবে বর্ণনা করেছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস একে উত্তরপ্রদেশের আদলে “জঙ্গল রাজ” এবং আইন বহির্ভূত হত্যা বলে তীব্র কটাক্ষ করেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও এনকাউন্টারের বিবরণ

গত শনিবার বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকায় এক ১২ বছরের নাবালিকা নিখোঁজ হওয়ার পর রবিবার একটি পুকুর থেকে তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার হয়। ময়নাতদন্তে নাবালিকাকে ধর্ষণের পর জ্যান্ত অবস্থায় পুকুরে ডুবিয়ে মারার প্রমাণ মেলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় বারুইপুর। উত্তেজিত জনতা পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনকি ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল নামে এক নিরপরাধ যুবকেরও মৃত্যু হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে এবং মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। বারুইপুর জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ৪৫ মিনিটে তদন্তের স্বার্থে প্রভাস মণ্ডলকে ঘটনাস্থলে অপরাধের পুনর্নির্মাণের (Crime Scene Reconstruction) জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি, পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ঠিক আগে প্রভাস আচমকাই এক পুলিশ কর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং পালানোর চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে প্রভাস গুরুতর আহত হয়। তাকে দ্রুত বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

বিজেপির প্রতিক্রিয়া: ‘ঐশ্বরিক বিচার’ ও কড়া বার্তা

বিজেপি নেতৃত্ব এই এনকাউন্টারকে সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার এই ঘটনাকে “ঐশ্বরিক বিচার” (Divine Justice) বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, কোনো অপরাধীকেই রেহাই দেওয়া হবে না এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কেউ পার পাবে না।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তকে এই পুরো ঘটনার ওপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নাবালিকার নিখোঁজ ডায়েরি করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে ১ শতাংশও গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, নিরপরাধ ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও খুনের মামলা রুজু করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তৃণমূলের তোপ: ‘ইউপি মডেল’ ও ‘জঙ্গল রাজ’

প্রভাস মণ্ডলের এই এনকাউন্টারকে একটি ‘পরিকল্পিত নাটক’ বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজ্য পুলিশকে প্রশ্ন করেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, এটা কী হচ্ছে? নতুন বাংলায় আপনাকে স্বাগত—উত্তরপ্রদেশ ২.০।” তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে আইনের শাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গকে ‘জঙ্গল রাজ’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্য এক বিস্ফোরক অভিযোগে তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ দাবি করেছেন যে, এই এনকাউন্টারটি আসলে বিজেপির অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার একটি অপচেষ্টা। কীর্তি আজাদের দাবি, “প্রভাস মণ্ডল মূলত বিজেপির একজন কর্মী ছিলেন এবং তাঁর কাছে দলের অনেক অভ্যন্তরীণ ও সংবেদনশীল তথ্য ছিল। সে যাতে মুখ না খোলে, তার জন্যই এই এনকাউন্টারের নাটক সাজানো হয়েছে। পুলিশের হেফাজতে থাকা একজন অপরাধী কীভাবে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে পারে?”

তবে তৃণমূলের অন্দরেই এই নিয়ে কিছুটা ভিন্ন সুরও শোনা গেছে। কেশপুরের তৃণমূল বিধায়ক শিউলি সাহা জানান, আইন অনুযায়ী যদি কোনো অপরাধী পালানোর জন্য পুলিশের ওপর হামলা চালায়, তবে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পদক্ষেপ করতেই পারে। তবে সমস্ত এনকাউন্টারই আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকা উচিত।

বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি কংগ্রেসের

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে মুখ খুলেছে কংগ্রেসও। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বারুইপুরের এই এনকাউন্টার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সমগ্র ঘটনাটির একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত (Judicial Probe) দাবি করেছেন। ছাত্র কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে, কোনো অপরাধীর শাস্তি নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের, পুলিশের নয়। দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা উচিত ছিল।

মূল অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর বারুইপুর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্কনপ্রসাদ বারুইয়ের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র‍্যাফ (RAF) মোতায়েন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও বিবৃতির জেরে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply