কলকাতা, ২৬ আগস্ট:
সরকারি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের বহির্বিভাগের একটি টিকিট ঘিরে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে নেটমাধ্যমে। সেই টিকিটের ক্লিনিক্যাল নোটে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে যে রোগীকে তাঁর স্ত্রী কামড়ে দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, ওই একই টিকিটে চিকিৎসকের পরামর্শ হিসেবে লেখা রয়েছে এক অদ্ভুত নিদান। সেখানে বলা হয়েছে, বউয়ের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। রাজ্যের অন্যতম সেরা হাসপাতাল এসএসকেএমের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের এমন একটি প্রেসক্রিপশন আচমকাই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। সত্যিই কি কোনও চিকিৎসক এমন মজার পরামর্শ দিয়েছেন, নাকি পুরো বিষয়টিই সাজানো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই ভাইরাল হওয়া টিকিটের সত্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গত সোমবার সকাল থেকেই এসএসকেএম হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের ওই প্রেসক্রিপশনটি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খোদ চিকিৎসকদের মোবাইলেও ঘুরতে থাকে। ওই ওপিডি টিকিটে রোগীর একটি স্পষ্ট হেলথ আইডিও রয়েছে। পাশাপাশি রোগীর বয়সের জায়গায় লেখা রয়েছে ৫৭ বছর এবং লিঙ্গ হিসেবে পুরুষ উল্লেখ করা হয়েছে। টিকিট অনুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট শনিবার ওই ব্যক্তি এসএসকেএম হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের বহির্বিবাগে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। ওই নির্দিষ্ট দিনে বহির্বিভাগের দায়িত্বে যে তিনজন চিকিৎসক ছিলেন, তাঁদের নামও ওই প্রেসক্রিপশনে জ্বলজ্বল করছে। তাঁরা হলেন ডাক্তার অমলেশ বসাক, ডাক্তার তুহিন রায় এবং ডাক্তার স্বর্ণালী মণ্ডল। এখন প্রশ্ন উঠছে, এঁদের মধ্যে কেউ কি সত্যিই ওই রোগীকে পরীক্ষা করে এমন অদ্ভুত পরামর্শ দিয়েছেন, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য।
এই প্রসঙ্গে নানামুনির নানা মত সামনে আসছে। কেউ কেউ মনে করছেন যে এই টিকিটটি সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আবার এসএসকেএমের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের খোদ চিকিৎসকরাও পুরো বিষয়টি নিয়ে গভীর ধন্দে পড়েছেন। গত ১৪ আগস্ট এমন কোনও রোগী আদৌ তাঁদের কাছে এসেছিলেন কি না, তা ওপিডির দায়িত্বে থাকা নার্স বা চিকিৎসকদের কেউই স্পষ্ট করে মনে করতে পারছেন না। এই ভাইরাল টিকিটের সবচেয়ে বড় খটকা হল, সেখানে রোগীর নামের জায়গাটি অত্যন্ত সন্তর্পণে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অথচ ক্লিনিক্যাল নোটের জায়গায় স্পষ্ট ইংরেজিতে ওয়াইফ বাইট অর্থাৎ স্ত্রীর কামড়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। এমনকি রোগীর ক্ষতস্থান লাল হয়ে ফুলে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, ওই একই প্রেসক্রিপশনে রোগীকে গ্যাসের সমস্যা দূর করার ওষুধ, ব্যথা কমানোর ওষুধ এবং ত্বকের সংক্রমণে ব্যবহৃত মলমও লিখে দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশের ধারণা, যেভাবে প্রেসক্রিপশনটি লেখা হয়েছে তা খুব একটা আনাড়ি হাতের কাজ বলে মনে হচ্ছে না। তাঁদের অনুমান, অন্য কোনও জায়গা থেকে বা অনলাইনে এই হাসপাতালের একটি সাধারণ টিকিট বের করা হয়েছে। তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে সেই টিকিটে এমন কিছু বিভ্রান্তিকর এবং হাস্যকর কথা লিখে দেওয়া হয়েছে, যাতে তা সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এরপর সেই বিকৃত ছবিটি অন্য কাউকে দিয়ে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। নেটিজেনদের একাংশ এটিকে নিছক একটি মজার ঘটনা হিসেবে দেখলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিন্তু বিষয়টি মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। রাজ্যের এমন একটি স্বনামধন্য সরকারি হাসপাতালের নাম জড়িয়ে এই ধরনের ভুয়ো বা বিকৃত তথ্য ছড়ানোর নেপথ্যে কার কী অসাধু উদ্দেশ্য রয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে এবং দোষীদের খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যেই এসএসকেএম কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ভবানীপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের তদন্তের পরেই এই ভাইরাল প্রেসক্রিপশনের আসল রহস্য প্রকাশ্যে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

