মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেজিংয়ের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেজিংয়ের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন

বেইজিং, ১৭ জুলাই: মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেজিংয়ের হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং কুৎসাজনক বলে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বেইজিং কোনোদিন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না এবং মার্কিন নির্বাচন নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এহেন ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে চীন ওয়াশিংটনকে নিজের আচরণ পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে এবং নির্বাচন ঘিরে বেইজিংকে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কঠোর বার্তা পাঠিয়েছে।

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন প্রাইমটাইম ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচন তথ্য চুরির পেছনে চীন জড়িত ছিল, যার মধ্যে প্রায় ২২০ মিলিয়ন ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য ও ফাইল অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন যে, হোয়াইট হাউস কর্তৃক প্রকাশিত সিআইএ (CIA) রিপোর্টের তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করেছে একটি অভ্যন্তরীণ ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) চক্র। এই অভিযোগের সমর্থনে কিছু নথি প্রকাশ করা হলেও আন্তর্জাতিক মহল ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পূর্বতন মূল্যায়নের সঙ্গে এই তথ্যের স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা গেছে। ২০২১ সালের মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (ODNI) এক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে, রাশিয়া বা চীন কোনো পক্ষই ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের প্রযুক্তিগত বা সামগ্রিক ফলাফল পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দীর্ঘ ভাষণের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বেইজিংয়ে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগের কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, “চীনের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং এটি একটি বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি চীন সর্বদা মেনে চলে। মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না এবং ভবিষ্যতেও নেই।”

একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের দিকে ইঙ্গিত করে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন লিন জিয়ান। তিনি মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব ভালো করেই জানে কোন দেশ পৃথিবীর অন্য প্রান্তের বিভিন্ন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে অভ্যস্ত, কারা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসা, সাধারণ নাগরিক ও সরকারের ওপর নির্বিচারে নজরদারি চালায় এবং বিশাল স্কেলে বিদেশি নাগরিকদের ডেটা বা তথ্য চুরি করে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান এমন এক সময়ে এলো যখন দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছিল। গত মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করেছিলেন এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক সম্পন্ন করেন。 সেই সময় দুই নেতার মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং পারস্পরিক উদ্বেগগুলোকে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে ঐক্যমত্য তৈরি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে, যার আমন্ত্রণ ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন।

তবে ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও তীব্র চীন-বিরোধী অবস্থান এই হাই-প্রোফাইল সফরকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চীনের ফুদান ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ঝাও মিংহাও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প মে মাসের চীন সফর থেকে ফেরার পর থেকেই ঘরের মাঠে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন যে তিনি চীনের প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন। ফলে নিজের কঠোর অবস্থান প্রদর্শন এবং আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখেই ট্রাম্প এই কৌশলগত অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বেইজিংয়ের রেনমিন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক দিয়াও দমিংয়ের মতে, ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক আক্রমণ মে মাসের শীর্ষ সম্মেলনের ইতিবাচক ধারাকে ব্যাহত করতে পারে। আমেরিকা যদি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ধারাবাহিকভাবে চীনকে ব্যবহার করতে থাকে, তবে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার যে বিরল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেইজিং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, চীন ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মসৃণ রাখতে হলে বানোয়াট অভিযোগ বন্ধ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply