নয়াদিল্লি, ১৭ জুলাই:
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক এক নতুন মাত্রা নিল। নরওয়ের খ্যাতনামা রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিক হেল্প লিং সভেনসেন (Helle Lyng Svendsen) সম্প্রতি একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে দাবি করেছেন যে, ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-র কার্যনির্বাহী সম্পাদক আদিত্য রাজ কাউল তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দিয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বাদানুবাদ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সভেনসেনের করা একটি বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে। এর আগের দিন তিনি একটি পোস্টে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বিক্ষোভের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছিলেন, “আপনাদের দেশে অনশন (Hunger strike) চলছে।” তাঁর এই মন্তব্যের পর ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশ এবং বেশ কিছু সিনিয়র সাংবাদিক তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন। বিদেশি নাগরিক হয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অনধিকার চর্চা করার অভিযোগে সভেনসেনকে বিদ্ধ করা হয়। এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই এনডিটিভি-র সম্পাদক আদিত্য রাজ কাউল সভেনসেনের অ্যাকাউন্টটি ব্লক করেন।
নিজের অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে সভেনসেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্ক্রিনশটটি পোস্ট করে একটি সুপরিচিত ইংরেজি প্রবাদ ব্যবহার করে লিখেছেন, “ইফ ইউ কান্ট হ্যান্ডেল দ্য হিট, গেট আউট অফ দ্য কিচেন” (অর্থাৎ, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে ময়দান থেকে সরে দাঁড়ানোই শ্রেয়)। সভেনসেনের দাবি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বা সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকে কোনো যৌক্তিক সমালোচনা বা মন্তব্য করা হলে, তা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়। এই ব্লক করার ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ বলে তিনি মনে করেন।
সভেনসেনের এই পোস্টটির পর এক্স-এ কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে। ভারতীয় নেটিজেনরা নরওয়েজীয় এই ধারাভাষ্যকারকে পাল্টা আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বেশ কিছু ব্যবহারকারী বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে (World Press Freedom Index) নরওয়ের শীর্ষ অবস্থানের বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা মনে করিয়ে দেন যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বুলি আওড়ালেও নরওয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রুশ নিউজ চ্যানেলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। একদিকে বাকস্বাধীনতার কথা বলা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্তরে নির্দিষ্ট গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা—নরওয়ের এই দ্বিমুখী নীতির দিকে আঙুল তুলেছেন অনেকে।
পাশাপাশি, ভারতের নেটিজেনদের মূল আপত্তির জায়গা ছিল সভেনসেনের অনধিকার চর্চা। তাঁদের বক্তব্য, নরওয়ের একজন নাগরিক হয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ বা অনশন আন্দোলন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানিমূলক মন্তব্য করার কোনো এক্তিয়ার সভেনসেনের নেই। অনেকেই আদিত্য রাজ কাউলের ব্লক করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, অযাচিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকে এড়িয়ে চলাই সঠিক পদক্ষেপ।
অন্যপক্ষে, আন্তর্জাতিক মহলের কিছু মুক্তমনা ব্যবহারকারী সভেনসেনের বক্তব্যকে সমর্থন করে লিখেছেন যে, বিশ্বায়নের এই যুগে যেকোনো দেশের মানবাধিকার বা সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করার অধিকার বিশ্ব নাগরিকদের রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ভারতীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকারদের মধ্যকার এই দ্বৈরথ সাইবার দুনিয়ায় একটি বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
