প্যারিস, ৮ সেপ্টেম্বর:
এক হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধিদলের ব্যক্তিগত সফরের সময় নারী কর্মীদের কাজের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠল ফ্রান্স। এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার কর্মীদের ওয়াকআউট ও ধর্মঘটের কারণে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র আইফেল টাওয়ার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় কর্তৃপক্ষকে। ঘটনাটিকে ঘিরে ফরাসি রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্যারিস প্রশাসন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার, যখন স্বামীনারায়ণ ভাবধারার সংগঠন বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা বা বিএপিএস-এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় একশো জনের একটি প্রতিনিধিদল আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে যায়। প্যারিসের শহরতলিতে নবনির্মিত একটি হিন্দু মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে তারা ফ্রান্সে অবস্থান করছিল। অভিযোগ ওঠে, এই প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনের সময় যাতে কোনো নারী কর্মীর সঙ্গে মুখোমুখি যোগাযোগ না হয়, সেই লক্ষ্যে কর্মরত নারী কর্মীদের নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে অন্য স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় টাওয়ার পরিচালনা কর্তৃপক্ষ।
কর্মীদের ইউনিয়ন প্রতিনিধি ডায়ান ডাভয়নে সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, প্রতিনিধিদলটি যখন টাওয়ার এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন নারী কর্মীদের তাঁদের কাজের স্থান ছেড়ে দূরে চলে যেতে বলা হয় এবং তাঁদের জায়গায় পুরুষ কর্মীদের দায়িত্বে বসানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের ঠিকাদার সংস্থার মাধ্যমে নিযুক্ত নারী কর্মীদেরও একই নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিকালীন সময়ে নারীদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চলাচলেও নিষেধ জারি করা হয়েছিল। এই পদক্ষেপে নারী কর্মীরা নিজেদের অপমানিত বোধ করেন এবং এর জেরেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার সকালে কর্মীদের অসন্তোষ চরমে পৌঁছায় এবং তারা কাজের জায়গায় না গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আইফেল টাওয়ারের প্রবেশপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হয় এবং দর্শনার্থীদের উদ্দেশ্যে কার্যনির্বাহী সমস্যার কারণে বিলম্বের নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। শ্রমিক সংগঠন সিজিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নারী কর্মীদের একপাশে সরিয়ে দেওয়া, পুরুষ কর্মী দিয়ে প্রতিস্থাপন করা এবং একপ্রকার অদৃশ্য করে রাখার এই নির্দেশিকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী সংস্থা সোসিয়েতে দেক্সপ্লয়াতাসিওঁ দ্য লা তুর আইফেল বা এসইটিই স্বীকার করেছে যে, পরিদর্শনে আসা প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে নারীদের সঙ্গে মেলামেশা সীমিত রাখার আবেদন জানানো হয়েছিল। সংস্থাটি সাফ জানিয়েছে, এই ধরনের অন্যায্য শর্ত মেনে নেওয়া কর্তৃপক্ষের একেবারেই উচিত হয়নি। সংস্থার প্রেসিডেন্ট এরিয়েল ওয়েইল জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে এই ঘটনা প্রসঙ্গে বিএপিএস প্যারিস মন্দিরের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে দুঃখপ্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। তাদের বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রতিনিধিদলের সদস্যসংখ্যা বেশি থাকায় সাধারণ দর্শনার্থীদের অসুবিধা যাতে না হয়, সেজন্য আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই সফরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে কাউকে প্রবেশে বাধা দেওয়া বা নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। কোনো ব্যক্তি এই পরিস্থিতিতে আঘাত পেয়ে থাকলে বা অসুবিধায় পড়লে তার জন্য তারা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানিয়েছেন, কর্মীদের ক্ষোভ সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত এবং ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মাটিতে নারী-পুরুষের সমতা কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের সামনে এসে থেমে যেতে পারে না। ফ্রান্সের জাতীয় সংসদের সভাপতি ইয়েল ব্রাউন-পিভে স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিদেশি অতিথিদের অযৌক্তিক চাহিদা মেটাতে দেশের নারীদের পাশে সরে যেতে বলা ফরাসি মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বও ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
