নাসিক,১০ জুলাই ২০২৬:: মহারাষ্ট্রের নাসিকের বহুল আলোচিত টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS) সংশ্লিষ্ট বিপিও কেন্দ্রে যৌন নিপীড়ন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত নিদা খানকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিল স্থানীয় আদালত। জামিন মঞ্জুর করার সময় নাসিক রোড আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক কে. জি. জোশী এক বেনজির ও ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ পেশ করেছেন। আদালত জানিয়েছে, যেকোনো নারীর জন্য কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে সন্তান প্রসব করার মানসিক ট্রমা বা যন্ত্রণা এবং তার সামাজিক কলঙ্ক বহন করা অত্যন্ত অসহনীয়। এই প্রসঙ্গে নিজের রায়ে বিচারক স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কারাবাসে জন্ম নেওয়ার পৌরাণিক দৃষ্টান্তও টেনে এনেছেন।
আদালতের দেওয়া বিস্তারিত রায়ে বিচারক কে. জি. জোশী উল্লেখ করেন, “ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো কারাগারের ভেতরে জন্ম নেওয়ার মানসিক যন্ত্রণা কিংবা এর সাথে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক কোনো মানুষের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। এই ধরনের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি এড়াতে এবং অনাগত নবজাতক শিশুর সুস্থ আবাহন ও সার্বিক কল্যাণের কথা মাথায় রেখে, অভিযুক্তের পক্ষে বিচার বিভাগীয় বিশেষ ক্ষমতা বা স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (Judicial Discretion) প্রয়োগ করাই ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত।”
বিচারালয় আরও যোগ করে যে, যেহেতু মামলার প্রাথমিক তদন্ত ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং তদন্তকারী দল আদালতে চার্জশিটও দাখিল করে দিয়েছে, তাই আবেদনকারী নিদা খানকে আর হেপাজতে আটকে রাখার কোনো আইনগত যৌক্তিকতা নেই।
গত মে মাসে প্রায় ৬ সপ্তাহ পলাতক থাকার পর নাসিক পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) নিদা খানকে গ্রেপ্তার করেছিল। আদালতে নিদা খানের পক্ষে জামিনের আবেদন জানিয়ে প্রবীণ আইনজীবী রাহুল কাসলিওয়াল সওয়াল করেন যে, তাঁর মক্কেল বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে যেন জামিন দেওয়া হয়। আইনজীবী দাবি করেন, নিদা খান সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং তাঁকে এই মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি কৌঁসুলি বিজয় গায়কোয়াড় এবং ভুক্তভোগীর পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী মিলিন্দ কুরকুটে ও নীতিন পণ্ডিত এই জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, তদন্তে কর্মক্ষেত্রে নারীদের ওপর যৌন শোষণ ও ধর্মীয় নিপীড়নের একাধিক গুরুতর প্রমাণ উঠে এসেছে, তাই অভিযুক্তকে মুক্তি দিলে তথ্য-প্রমাণ লোপাট বা সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আদালত উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর নিদা খানকে ৭৫,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড এবং সমপরিমাণ অর্থের জামিনদারের (Surety) বিনিময়ে কড়া শর্তে জামিন মঞ্জুর করে। একই সাথে সহ-অভিযুক্ত তৌসিফ আত্তারের জামিন মঞ্জুর হলেও, মূল অভিযুক্ত দানিশ শেখের জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আদালত।
নাসিকের দেওলালি ক্যাম্প থানায় এক দলিত নারী কর্মীর দায়ের করা এফআইআর-এর (FIR) ভিত্তিতে এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছিল। নিদা খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি ও মামলার অন্য অভিযুক্তরা মিলে ওই হিন্দু নারী কর্মীকে মগজধোলাই (Brainwash) করার চেষ্টা করছিলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছিলেন এবং জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণে প্ররোচিত করতে বোরকা ও ধর্মীয় বই উপহার দিয়েছিলেন। এই স্পর্শকাতর মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে নাসিক পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে, যা বর্তমানে এই বিপিও কেন্দ্রের কর্মীদের ওপর মানসিক ও ধর্মীয় হেনস্থা সংক্রান্ত মোট ৯টি পৃথক মামলার তদন্ত করছে। ঘটনার পরই টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS) তাদের কড়া জিরো-টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে অভিযুক্ত কর্মীদের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছিল।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
