কলকাতা,১০ জুলাই ২০২৬: তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে দলের দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার জন্য টাকা তোলার অন্তর্বর্তী অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি আদালতের মাধ্যমে নিযুক্ত একজন বিশেষ আধিকারিক বা স্পেশাল অফিসারের (Special Officer) কড়া নজরদারিতে সম্পন্ন হবে। হাইকোর্টের এই রায়কে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনি টানাপোড়েনের মাঝে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর বিদ্রোহী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের দায়ের করা এফআইআর-এর (FIR) ভিত্তিতে বিধাননগর পুলিশ গত ১৯ জুন কলকাতার একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের তিনটি অ্যাকাউন্ট ‘ডেবিট ফ্রিজ’ বা লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছিল। অভিযোগে দাবি করা হয়েছিল, এই অ্যাকাউন্টগুলিতে ‘অপরাধের লব্ধ অর্থ’ (Proceeds of Crime) রয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ এই মামলার শুনানি চলাকালীন পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। আদালত প্রশ্ন তোলে, ১৮ জুন সন্ধে ৬টায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরদিনই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ১৯ জুন সকালে অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ করার পেছনে পুলিশের কাছে কী অকাট্য তথ্য ছিল? বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে পুলিশ এমন কোনো নির্দিষ্ট উপাদান বা প্রমাণ দেখাতে পারেনি, যার ভিত্তিতে একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এভাবে হুট করে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে পুলিশ এতটা তৎপরতা দেখায় না বলেও আদালত মন্তব্য করে।
তৃণমূলের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি ও কিশোর দত্ত আদালতে সওয়াল করেন যে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করার ফলে একটি রাজনৈতিক দলের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে পড়েছে, যা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। তাঁরা জানান, ২১৫ জন কর্মচারীর বেতন, অফিসের ভাড়া এবং আইনি লড়াইয়ের খরচ মেটানোর মতো জরুরি দায়বদ্ধতা আটকে রয়েছে। অন্যদিকে, তদন্তকারীদের আশঙ্কা ছিল যে অ্যাকাউন্ট চালু রাখলে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হতে পারে।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ভারসাম্য বজায় রাখতে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ আধিকারিক বা স্পেশাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করেছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। আদালতের নির্দেশিকা অনুযায়ী:
১. এই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে টাকা কেবল দলের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম (Day-to-day expenses) এবং আইনি লড়াইয়ের খরচ মেটানোর জন্যই ব্যবহার করা যাবে।
২. বড় বা ছোট অন্য কোনো ধরণের খরচের অনুমতি স্পেশাল অফিসার দেবেন না।
৩. টাকা তোলার জন্য দলের যেকোনো দুজন অনুমোদিত আধিকারিকের সই করা চেক প্রথমে স্পেশাল অফিসারের কাছে পেশ করতে হবে। তিনি চেকে কাউন্টার-সাইন (Countersign) করার পরই কেবল ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা যাবে।
৪. স্পেশাল অফিসারকে তাঁর কাজের জন্য অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মাসে ১.২৫ লক্ষ টাকা সাম্মানিক বা অনারারিয়াম দেওয়া হবে।
শুনানি চলাকালীন অপর এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী দাবি করে যে তারাই ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস এবং এই টাকা ব্যবহারের অধিকার তাদের পাওয়া উচিত। তবে বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কোন গোষ্ঠী আসল তৃণমূল, সেই বিতর্কটি বর্তমানে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) বিচারাধীন এবং এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে আদালত কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে না। একই সাথে, ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে এই অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সমস্ত বৈদ্যুতিন তথ্য ও লেনদেনের রেকর্ড সুরক্ষিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর, যেখানে পুলিশকে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
