বিশেষ সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো যেখানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এর পেছনে পাবলিক ফান্ডিং বা সরকারি অনুদান দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে ভারত হাঁটছে ঠিক তার উল্টো পথে। ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যের ভাষার দোহাই দিয়ে ভারত সরকার এমন একটি পশ্চিমা ছদ্ম-বিজ্ঞানকে (Western Pseudoscience) কোটি কোটি টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে, যা খোদ পশ্চিমের দেশগুলো বহু আগেই বর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউজলন্ড্রি’ (Newslaundry)-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা-নীতি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে ভারতের কমপ্লিট অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর একটি পারফরম্যান্স অডিটের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের আয়ুষ (AYUSH) বিভাগের ওপর একটি অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেবল উত্তরপ্রদেশেই হোমিওপ্যাথি সেবার জন্য ২,৭১৭.৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অডিটররা যখন রাজ্যের বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি বা দাতব্য চিকিৎসালয়গুলোতে সরজমিনে তদন্ত চালান, তখন দেখা যায় যে প্রায় ৮১ শতাংশ ডিসপেনসারিতে সাধারণ ড্রেসিং করার সামগ্রী বা প্রাথমিক চিকিৎসার (First-aid) কোনো ন্যূনতম উপকরণই নেই। অর্থাৎ, যে চিকিৎসা ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা নিয়ে খোদ চিকিৎসা বিজ্ঞানেই তীব্র বিতর্ক রয়েছে, তার পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালা হলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় গজ-ব্যান্ডেজটুকুও ডিসপেনসারিগুলোতে মিলছে না।
বিশ্বের বহু দেশের স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ নিয়ামক সংস্থাগুলো বিস্তর গবেষণার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় ২০০৯ সাল থেকে হওয়া ৬৪টি নিয়মতান্ত্রিক গবেষণার রিপোর্ট খতিয়ে দেখে পরিষ্কার জানানো হয়েছে যে—যেকোনো রোগীর ক্ষেত্রে, যেকোনো রোগের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা কেবল একটি ‘প্লাসবো এফেক্ট’ (Placebo Effect) বা মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তা সত্ত্বেও ভারত সরকার এই প্রমাণিত সত্যকে উপেক্ষা করে চলেছে।
বিশ্বের তিনটি বড় দেশ যেভাবে হোমিওপ্যাথি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. অস্ট্রেলিয়া (২০১৫): দেশটির ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল টানা দুই বছর ধরে ১৭৬টি স্বতন্ত্র গবেষণা ও ৬৮টি স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর করা ৫৭টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা খতিয়ে দেখে এক বাক্যে জানিয়ে দেয়—এমন কোনো রোগ বা স্বাস্থ্য সমস্যা নেই, যেখানে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২. যুক্তরাজ্য (২০১৭): যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) ২০১৭ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হোমিওপ্যাথির প্রেসক্রিপশন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। তৎকালীন এনএইচএস প্রধান সাইমন স্টিভেন্স সরাসরি একে “সরকারি ফান্ডের অপচয়” বলে অভিহিত করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ হোমিওপ্যাথিক অ্যাসোসিয়েশন আদালতে গেলেও হাইকোর্ট সরকারের সিদ্ধান্তকেই বহাল রাখে।
৩. ফ্রান্স (২০১৯-২০২১): ফ্রান্সে হোমিওপ্যাথি অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ২০১৯ সালে দেশটির ‘হাউতে অথরিটি ডি সান্তে’ প্রায় ১,২০০টি হোমিওপ্যাথিক পণ্যের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সরকারি ভরতুকি বন্ধের সুপারিশ করে। ফলস্বরূপ, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ফ্রান্স সরকার তাদের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল থেকে হোমিওপ্যাথির জন্য অর্থ বরাদ্দ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যা ২০১৮ সালেও ফরাসি সরকারের প্রায় ১২৬.৮ মিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় করে।
যেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রকৃত অর্থ বরাদ্দ সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে সম্পূর্ণ প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করে ভারতের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা একটি আত্মঘাতী নীতি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নিজস্ব ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার নামে মূলত ১৭৯৬ সালে জার্মানিতে আবিষ্কৃত একটি চিকিৎসা পদ্ধতিকে ‘দেশি গৌরব’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার বদলে কেবল বিভ্রান্তিই বাড়াচ্ছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
