ওয়েনাড়ের ধস আসলে একটি ‘ম্যান-মেড’ বা মনুষ্যসৃষ্ট ট্র্যাজেডি

ওয়েনাড়ের ধস আসলে একটি ‘ম্যান-মেড’ বা মনুষ্যসৃষ্ট ট্র্যাজেডি

ওয়েনাড়,১০ জুলাই ২০২৬:: ২০২৪ সালের ৩০শে জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত মুণ্ডক্কাই ও চুরলমালার ভয়াবহ ধসের স্মৃতি এখনও এদেশের মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি, যেখানে প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ঠিক তার দু’বছরের মাথায়, ২০২৬ সালের ৭ই জুলাই মঙ্গলবার, কেরালার পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ওয়েনাড়ের মেপ্পাদির কাছে কাল্লাডিতে আবারও এক ভয়াবহ ধস নামল। এই সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে অন্তত ৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ। কিন্তু এই দুর্যোগ প্রকৃতির কোনো আকস্মিক তাণ্ডব নয়। জাতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire) এবং ‘দ্য নিউজ মিনিট’ (The News Minute)-এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ট্র্যাজেডি সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব ছিল এবং এটি আসলে চরম প্রশাসনিক ও ঠিকাদারী গাফিলতির ফসল—এক কথায় একটি ‘ম্যান-মেড’ বা মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়।

প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ঢালে ঘটা পূর্ববর্তী ধসগুলোর চেয়ে এবারের ঘটনাটি সম্পূর্ণ আলাদা। এবারের ধসটি ঘটেছে এমন একটি এলাকায়, যা পুরোপুরি মানুষের অবিবেচক কার্যকলাপের দ্বারা পরিবর্তিত হয়েছিল। কোঝিকোড় ও ওয়েনাড়ের মধ্যে সংযোগকারী অত্যন্ত বিতর্কিত এবং কোটি কোটি টাকার ‘আনাক্কামপোয়িল-কাল্লাডি-মেপ্পাদি’ টুইন টানেল (সুড়ঙ্গ পথ) প্রকল্পের প্রবেশদ্বারের ঠিক কাছেই, মীনাক্ষী ব্রিজের সংলগ্ন এলাকায় এই বিপর্যয় ঘটে।

সুড়ঙ্গ খননের ফলে প্রায় এক লক্ষ কিউবিক মিটার মাটি ও বর্জ্য স্তূপাকার করে রাখা হয়েছিল ওই পাহাড়ি ঢালে। গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে সেই খননকৃত মাটির বিশাল পাহাড় হুড়মুড় করে ধসে পড়ে নিচের উপত্যকায়। যার নিচে চাপা পড়ে যায় শ্রমিকদের আবাসন, বেশ কিছু গাড়ি ও একটি আস্ত ট্যাঙ্কার লরি।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, প্রশাসন এই আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিল। সরকারি নথিপত্র এবং গণপূর্ত দপ্তরের (PWD) সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে যে, বিপর্যয়ের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে, ২০ থেকে ২৫শে জুনের মধ্যে কেরালার রাজ্য প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা ভূপাল-ভিত্তিক ‘দিলীপ বিল্ডকন লিমিটেড’ (Dilip Buildcon Limited) এবং রূপায়ণকারী সংস্থা ‘কোঙ্কন রেলওয়ে কর্পোরেশন’ (KRCL)-কে দু-দুটি লিখিত সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল।

ওয়েনাড়ের জেলাশাসক ডি. আর. মেঘশ্রী গত ২০শে জুন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ওই জমে থাকা বিপজ্জনক মাটির স্তূপ না সরানো পর্যন্ত সুড়ঙ্গের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। এরপর ২৫শে জুন একটি উচ্চপর্যায়ের জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ দপ্তরের প্রতিনিধি দল সাইটটি পরিদর্শন করে জানায় যে, মাটির এই বিশাল স্তূপটির কারণে ‘সয়েল পাইপিং’ (Soil Piping) বা মাটির অভ্যন্তরীণ ধস এবং ঢালের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। ঠিকাদার সংস্থা যে নামমাত্র প্রোটেকশন ওয়াল বা টারপলিন দিয়ে মাটি ঢেকে রেখেছিল, তা বর্ষার জলের তোড় আটকানোর জন্য যে একেবারেই পর্যাপ্ত নয়, তাও লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্ত সতর্কবার্তা ও নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ চালানো হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি এই মর্মান্তিক মৃত্যু।

এই ঘটনার পর কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি. সতীশন এবং ওয়েনাড় জেলার দায়িত্বে থাকা কৃষিমন্ত্রী টি. সিদ্দিকী সরাসরি ঠিকাদার সংস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। মন্ত্রী টি. সিদ্দিকী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি সম্পূর্ণ মনুষ্যসৃষ্ট ধস। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি না মেনে যত্রতত্র সুড়ঙ্গের মাটি স্তূপ করে রাখার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

অন্যদিকে, ঠিকাদার সংস্থা দিলীপ বিল্ডকন তাদের গাফিলতির দায় অস্বীকার করে এটিকে ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ বলে দাবি করেছে। তাদের যুক্তি, ২৪ ঘণ্টায় ২৬৫ মিলিমিটারের অভূতপূর্ব মেঘভাঙা বৃষ্টিই এই ধসের মূল কারণ এবং তারা সমস্ত পরিবেশগত নিয়ম মেনেই কাজ করছিল। তবে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধুমাত্র ঠিকাদার সংস্থাকে দোষ দিয়ে সরকার নিজের দায় এড়াতে পারে না। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মতো পরিবেশগতভাবে ভঙ্গুর এবং ধসপ্রবণ এলাকায় এই ধরণের মেগা পরিকাঠামো প্রকল্পের অনুমতি দেওয়াই ছিল প্রথম ভুল সিদ্ধান্ত।

পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিল বহু বছর আগেই পশ্চিমঘাট পর্বতমালা রক্ষার্থে যে সতর্কতা জারি করেছিলেন, তা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। কাল্লাডির এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন বৃষ্টির ধরণ বদলে যাচ্ছে, তখন প্রকৃতির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে করা ‘উন্নয়ন’ কীভাবে সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠছে।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply