নয়াদিল্লি, ২৫ জুলাই: নিট (NEET-UG) প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের প্রতিবাদে রাজধানী দিল্লিতে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ওপর দিল্লি পুলিশের সাম্প্রতিক দমনপীড়ন ও বলপ্রয়োগ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ ভবন অভিযান ও যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সামলাতে লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া এবং ঢালাও গ্রেফতারির ঘটনা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার আসল ভূমিকা নিয়ে। দিল্লি পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত হওয়ায়, এই বলপ্রয়োগের দায়ভার সরাসরি এসে পড়ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সর্বোচ্চ শীর্ষনেতা তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ওপর। সার্বিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে নেমে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’ (The Wire) ১২টি সুনির্দিষ্ট ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যার সরাসরি ও স্পষ্ট জবাব অমিত শাহের দেওয়া উচিত বলে দাবি করা হয়েছে।
‘দ্য ওয়ার’-এর বিশদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া ছাত্র-যুবদের ওপর পুলিশি তাণ্ডব চালানো হয়েছে। যে ১২টি প্রশ্ন এখন কেন্দ্র তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দরবারে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলি নিম্নরূপ:
১. অন্যায্য বলপ্রয়োগের কারণ: প্রথমত, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানাতে আসা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর কোন পরিস্থিতির নিরিখে টিয়ার গ্যাস ও নির্মম লাঠিচার্জ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
২. আইনি মানদণ্ড লঙ্ঘন: দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারীদের আটক করার সময় দিল্লি পুলিশ কি নির্দিষ্ট আইনি মানদণ্ড ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) মেনে চলেছে? ‘দ্য ওয়ার’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, বেশ কয়েকজন ছাত্র ও ছাত্রীকে যেভাবে টানা-হ্যাঁচড়া করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছে, তাতে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রই স্পষ্ট।
৩. মহিলা পুলিশকর্মীদের অনুপস্থিতি: তৃতীয়ত, নারী শিক্ষার্থীদের আটক ও সামলানোর সময় ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত সংখ্যক মহিলা পুলিশকর্মী কেন উপস্থিত ছিলেন না?
৪. আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই পাল্টা এফআইআর: চতুর্থত, পুলিশের লাঠির আঘাতে কয়েক ডজন আহত ছাত্র হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও, পুলিশ কেন তাঁদের বিরুদ্ধেই পাল্টা এফআইআর (FIR) দায়ের করে কণ্ঠরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে?
৫. রাজনৈতিক নির্দেশের ভূমিকা: পঞ্চম প্রশ্ন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লি পুলিশ কি আন্দোলনকারীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক নির্দেশে এই কঠোর দমনমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে?
৬. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নীরবতা: ষষ্ঠত, যখন লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর জীবন ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির দরুণ ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে সামনে এসে আক্রান্ত পরীক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের আস্থা জোগাতে ব্যর্থ কেন?
৭. অপরাধীদের বনাম আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষিপ্রতা: সপ্তমত, অভিযুক্ত দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র ও প্রশ্নফাঁসে যুক্ত মূল অপরাধীদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের যে তত্পরতা দেখা যাওয়ার কথা ছিল, সেই একই শক্তি ও ক্ষিপ্রতা কেন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ভাঙতে ব্যবহার করা হচ্ছে?
৮. প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনের অপব্যবহার: অষ্টমত, দিল্লিতে আন্দোলনরত ছাত্রনেতা ও নাগরিক সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন বা আগাম আটকের নামে সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার অধিকার পুলিশকে কে দিল?
৯. চিহ্নিত প্রতিবাদস্থলে বিধিনিষেধ: নবম প্রশ্ন তুলে ‘দ্য ওয়ার’ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের মতো নির্ধারিত ও চিহ্নিত প্রতিবাদস্থলে নাগরিক আন্দোলনের ওপরও কেন একের পর এক বিধিনিষেধ চাপিয়ে আন্দোলনকারীদের বলপ্রয়োগ করে ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছে?
১০. বিরোধীদের কণ্ঠে বাধা: দশম প্রশ্ন, বিরোধী দলীয় সাংসদ ও নেতৃত্বকে যখন পার্লামেন্ট বা রাজপথে ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন জানাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তখন গৃহ মন্ত্রক কি পরোক্ষভাবে গণমাধ্যম ও বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ রাখতে চাইছে?
১১. বিভাগীয় তদন্তের অভাব: একাদশ প্রশ্ন, আন্দোলন দমনে পুলিশের এমন হিংসাত্মক ও নিয়মবহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বা বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেবে কি না?
১২. লাঠি দিয়ে অসন্তোষ দমনের চেষ্টা: এবং দ্বাদশ প্রশ্ন, দেশের তরুণ প্রজন্মের যৌক্তিক ক্ষোভ প্রমিতভাবে নিরসন না করে কেবল পুলিশের বুট ও লাঠি দিয়ে কি আদৌ এই জাতীয় গণআন্দোলন দমন করা সম্ভব?
‘দ্য ওয়ার’-এর এই ধারালো বিশ্লেষণ ও প্রশ্নাবলি সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলেও শোরগোল পড়ে গিয়েছে। জাতীয় স্তরে বিরোধীরা একযোগে কেন্দ্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে সরব হলে কেন পুলিশের বুটের তলায় তাঁদের পিষে ফেলার চেষ্টা করা হবে? সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন নিট কেলেঙ্কারির পাশাপাশি এখন দিল্লির রাজপথে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের সলতে পাকানো শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই ১২টি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে আগামী দিনে ছাত্র-যুবদের ক্ষোভ যে দাবানলের মতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে ওয়াকিবহাল মহল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
