ভুবনেশ্বর, ২৬ জুলাই: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরেই রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভুবনেশ্বরের বিজেপি সাংসদ অপরাজিতা ষড়ঙ্গীর (Aparajita Sarangi) কন্যা অর্চিতা ষড়ঙ্গীর (Archita Sarangi) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পোস্ট ঘিরে এখন তোলপাড় ওড়িশার ক্ষমতাসীন দলের অন্দরমহল। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর প্রকাশ্যে আসতেই নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ‘জয় হিন্দ’ লিখে উল্লাস প্রকাশ করেছেন অর্চিতা। শুধু তা-ই নয়, খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম রাজনৈতিক চাপ ও সমালোচনা সত্ত্বেও সেই বিতর্কিত ইনস্টাগ্রাম স্টোরি মুছে ফেলতে সাফ অস্বীকার করেছেন তিনি। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নিজস্ব দলীয় সাংসদের পরিবারের সদস্যের এমন অবাধ্য ও বিদ্রোহাত্মক মনোভাব ওড়িশা বিজেপির অন্দরে প্রবল বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি ২০২৬’-এর বিতর্কিত প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি, ব্যাপক কারচুপি এবং লাগাতার পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর সামনে আসার পর দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমছিল দেশজুড়ে। দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ছাত্র বিক্ষোভ এবং সিজেপি সহ একাধিক ছাত্র সংগঠনের জোরালো আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সারা দেশ যখন এই পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ভুবনেশ্বরের বিজেপি সাংসদের কন্যার এই প্রকাশ্য উল্লাস দলীয় নেতৃত্বের অস্বস্তি এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্চিতা ষড়ঙ্গী তাঁর ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে ঘটনাটিকে স্বাগত জানিয়ে ‘জয় হিন্দ’ বার্তা লিখে একটি স্টোরি শেয়ার করেন। মুহূর্তে সেই পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক মাধ্যমে পৌঁছাতেই শাসকদলের বিভিন্ন মহল থেকে সেটি মুছে ফেলার জন্য চরম মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হয় বলে সূত্রের দাবি। তবে নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরেননি অর্চিতা। কোনো রকম দলীয় চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি পোস্টটি নিজের অ্যাকাউন্টে বজায় রাখেন এবং নিজের স্পষ্ট বার্তার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে, যুবসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব।
বাহ্যিকভাবে অর্চিতার এই পদক্ষেপকে নিট কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এক তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত ‘ছাত্র বিদ্রোহ’ বা যুবসমাজের ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে দেখানো হলেও, এর পেছনে ওড়িশা বিজেপির গভীর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই প্রত্যক্ষ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
উপকূলীয় রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ খতিয়ে দেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি কেবল নিট আন্দোলনের প্রতিফলন নয়, বরং এটি ওড়িশা বিজেপির দুই হেভিওয়েট নেতার সুদীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরোক্ষ বহির্প্রকাশ। বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং ভুবনেশ্বরের বিদগ্ধ দলীয় সাংসদ অপরাজিতা ষড়ঙ্গী— উভয়ই ওড়িশার রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় মুখ। আগামী দিনে রাজ্যে দলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ ও নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের।
ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাকে ওড়িশা বিজেপির বিরোধী গোষ্ঠী নিজেদের একপ্রকার রাজনৈতিক জয় হিসেবে বিবেচনা করছে। সেই সুযোগেই সাংসদ-কন্যার এই উন্মুক্ত উল্লাস প্রকাশ ধর্মেন্দ্র বিরোধী শিবিরকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। সামাজিক মাধ্যমে অর্চিতার এই পোস্টের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেকেই এটিকে দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার পুরোনো অন্তর্দ্বন্দ্বের এক প্রকাশ্য রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
একদিকে জাতীয় স্তরে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা নিয়ে বিরোধীদের সাঁড়াশি আক্রমণ, আর অন্যদিকে দলের নিজস্ব সাংসদের ঘর থেকেই মন্ত্রীকে নিশানা করে পোস্ট— সার্বিক পরিস্থিতিতে বেশ ব্যাকফুটে ওড়িশা বিজেপি নেতৃত্ব। নিজ দলের সাংসদের কন্যার এমন প্রকাশ্য অবস্থান দলের শৃঙ্খলার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। যদিও এই বিষয়ে সাংসদ অপরাজিতা ষড়ঙ্গী বা রাজ্য বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত পদাধিকারীদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণ দেওয়া হয়নি।
নিট দুর্নীতির ক্ষোভ কাটিয়ে ওঠার আগেই ওড়িশার বিজেপি শিবিরের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অনমনীয় মনোভাব রাজ্য রাজনীতিতে আগামী দিনে নতুন কোনো নাটকের জন্ম দেয় কি না, এখন সে দিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখছে ওয়াকিবহাল রাজনৈতিক মহল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
