নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই: দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক, জলঘোলা এবং ছাত্র-যুবদের টানা গণআন্দোলনের মুখে অবশেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) পরিচালনগত অনিয়ম ঘিরে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন সংকটের আবহে তাঁর এই পদত্যাগ জাতীয় রাজনীতিতে এক বিরাট ঘটনা। কিন্তু ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাপত্র পেশ করার খবরটি প্রকাশ্যে আসার পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হু হু করে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার ও প্রেস কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ। যে ভিডিওতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে স্পষ্ট বলতে শোনা যাচ্ছে, “আমাদের সরকারের মন্ত্রীরা ইস্তফা দেন না, এটা ইউপিএ সরকার নয়!”
২০১৫ সালের এই পুরোনো ভিডিওটি নেট দুনিয়ায় আচমকাই নতুন করে ভাইরাল হয়ে ওঠার পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের ওপর বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র ও ধারালো হয়ে উঠেছে।
ভাইরাল ভিডিওটির প্রেক্ষাপট ও ২০১৫ সালের রাজনাথের মন্তব্য
প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটি এখনকার নয়; এটি দীর্ঘ ১১ বছর আগের, অর্থাৎ ২০১৫ সালের ২৪ জুনের। তৎকালীন ললিত মোদী বিতর্ক বা ‘ললিতগেট’ কাণ্ডের সময় বিরোধী দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এবং রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের ইস্তফার জোরালো দাবি তোলা হয়েছিল।
সেই সময় সাংবাদিক বৈঠকে বিরোধীদের সমস্ত দাবি সপাটে খারিজ করে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বুক ঠুকে বলেছিলেন, “আমাদের এখানে মন্ত্রীদের পদত্যাগ হয় না। এটি ইউপিএ সরকার নয়, এটি এনডিএ সরকার।” রাজনাথের সেই ঐতিহাসিক মন্তব্যই এখন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ফের নেটিজেনদের অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তৎকালীন সরকারের অনমনীয় অবস্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরতে বিরোধী দল ও সাধারণ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা রাজনাথের এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার করছেন।
মোদী সরকারের ১২ বছরের শাসনকালে বিরল ঘটনা
বিজেপি চালিত এনডিএ সরকারের দীর্ঘ ১২ বছরের কার্যকালে কোনো কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর আগে ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর ‘মি টু’ (Me Too) আন্দোলনের সময় অভ্যন্তরীণ চাপে পড়ে পদত্যাগ করেছিলেন তত্কালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর। তার পর থেকে একাধিক বিতর্ক সত্ত্বেও কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে দেখা যায়নি।
তবে নিট বিতর্ক ও ককোরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র নেতৃত্বে দিল্লির যন্তর মন্তরে লাগাতার আন্দোলন, বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সونم ওয়াংচুকের অনশন এবং দেশজুড়ে অভূতপূর্ব ছাত্র ক্ষোভের সামনে অবশেষে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র। ফলে দীর্ঘ সময়ের ঐতিহ্য ভেঙে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরে যেতে হওয়ায় নেটপাড়ায় রাজনাথ সিংয়ের পুরোনো মন্তব্যটি টেনে এনে চলছে তীব্র কটাক্ষ।
বিরোধীদের তোপ ও নেটপাড়ায় প্রতিক্রিয়া
ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে বিরোধীরা তোপ দেগে বলছেন, “যে সরকার দাবি করত যে তাদের কোনো মন্ত্রী ইস্তফা দেন না, আজ ছাত্র এবং যুবশক্তির ঐক্যের কাছে সেই অহংকার ভেঙে পড়েছে।” বিরোধী শিবিরের মতে, নিট কাণ্ডে সরকারের প্রশাসনিক ধস ও গাফিলতি এতটাই প্রকট হয়েছিল যে, পুরোনো রেকর্ড ধরে রাখা সরকারের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, বিজেপি সমর্থক ও ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, তৎকালীন ললিতগেট বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক নিট কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। ছাত্র সমাজ এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা, পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই শিক্ষা মন্ত্রী দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু কটাক্ষ ও ট্রোলের এই ডিজিটাল যুগে রাজনাথের সেই দশকের পুরোনো ‘নো পদত্যাগ’ মন্তব্য এখন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
