পটনা, ২৬ জুলাই: মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট (NEET-UG)-এর বিতর্কিত প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রতিবাদে রাজ্যব্যাপী ‘বিহার বন্ধ’-কে কেন্দ্র করে চরম নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিহারের রাজনীতিতে। বিহার বন্ধের সমর্থনে ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে পুলিশি ধস্তাধস্তি ও বিবাদে জড়ানোর অভিযোগে জনশক্তি জনতা দল (JJD) প্রধান তথা লালুপ্রসাদ যাদবের জ্যেষ্ঠ পুত্র তেজ প্রতাপ যাদবকে গ্রেফতার করল পটনা পুলিশ। শনিবার গভীর রাতে তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় বা জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পটনা সহ গোটা রাজ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে উঠেছে।
সংবাদ সংস্থা ওয়ানইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার নিট কেলেঙ্কারির স্বচ্ছ তদন্ত, পরীক্ষার্থীদের পুনর্বিচার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন বামপন্থী ও বিরোধী ছাত্র-যুব সংগঠন রাজ্যব্যাপী বন্ধের ডাক দিয়েছিল। রাজপথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রতিবাদের ময়দানে নামেন তেজ প্রতাপ যাদব। তিনি সমর্থকদের নিয়ে পটনার রামগোলাম চক থেকে ডাকবাংলো ক্রসিংয়ের দিকে মিছিল করে এগোতে থাকলে এক্সিবিশন রোডের কাছে পুলিশ তাঁকে ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। এই সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক বচসা ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়, যার পর তেজ প্রতাপ রাস্তায় বসেই অবস্থান বিক্ষোভে যোগ দেন।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ তেজ প্রতাপকে আটক করে সরিয়ে দিলেও বিকেলের দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনা নতুন মোড় নেয়। বিকেল গড়াতেই পটনার একটি অভিজাত শপিং মলে যখন তেজ প্রতাপ অবস্থান করছিলেন, তখন পটনা পুলিশের একটি বিশাল দল সিটি এসপি-র নেতৃত্বে সেখানে পৌঁছায় এবং তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করে। ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি বিশদ খতিয়ে দেখে পুলিশের দাবি— বন্ধ কর্মসূচি চলাকালীন এলাকায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও বিক্ষোভকারীদের উস্কানি দেওয়ার ক্ষেত্রে তেজ প্রতাপের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
পুলিশ তাঁকে যখন বিশেষ গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন পুলিশের গাড়ির দরজায় ঝুলে তেজ প্রতাপ সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন, “আমরা দেশের ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজের অধিকারের জন্য লড়ছি। তাদের ন্যায়বিচারের জন্য যদি আমাকে জেলে যেতে হয় বা জীবন দিতে হয়, আমি প্রস্তুত। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পুলিশি ভয় দেখিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না।”
অনটন ও অনিয়মের প্রতিবাদে শনিবারে ডাকা এই বিহার বন্ধের প্রভাব রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপকভাবে অনুভূত হয়। পটনার ডাকবাংলো মোড়ে বিক্ষোভকারীরা পথ অবরোধ করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটায় এবং লাঠিচার্জ করে এলাকা ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। বেশ কয়েক জায়গায় পথচলতি গাড়ি ও সরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। একই সাথে সমস্তিপুর, সিওয়ান, জাহাঙ্গীরপুর সহ অন্যান্য জেলাতেও রেল ও সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা।
বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে বিক্ষোভ দেখানোর প্রস্তুতি নিলেও পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসন ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের দমন করতে চাইছে। একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেবল আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানানোর জন্য যেভাবে মল থেকে আটক করে জেলে পাঠানো হলো, তা বিরোধীদের রাজনৈতিক কণ্ঠরোধের চেষ্টা বলেই মনে করছেন আরজেডি ও বিরোধী জোটের নেতারা।
তেজ প্রতাপ যাদবকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানোর পর বিহার জুড়ে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পটনার মহাত্মা গান্ধী ময়দান, ডাকবাংলো মোড় ও অন্যান্য স্পর্শকাতর এলাকায় অতিরিক্ত সশস্ত্র পুলিশ বল মোতায়েন করা হয়েছে। বিহার পুলিশ জানিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই আইন-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে দেওয়া হবে না এবং হিংসায় উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিট কেলেঙ্কারির জল আদালত পর্যন্ত গড়ালেও রাজপথে ছাত্রদের এই অসন্তোষ এবং তেজ প্রতাপের গ্রেফতারি বিহারের রাজনীতিকে এক নতুন সংঘাতের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। আগামী দিনে এই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র রূপ নিতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
