অমরাবতী/বিজয়ওয়াড়া: অন্ধ্রপ্রদেশে এক দলিত মহিলার রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতি ও মানবাধিকার মহলে তীব্র উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ‘দ্য অবজারভার পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT)-এর হেফাজতে থাকাকালীন ওই দলিত মহিলার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার ও স্থানীয় দলিত সংগঠনগুলি। এই ঘটনার পর দোষী পুলিশ আধিকারিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সমগ্র ঘটনার একটি নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্তের (Judicial Probe) দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরিবারের ক্ষোভ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট মামলার তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ বা বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) ওই দলিত মহিলাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছিল। কিন্তু হেফাজতে থাকাকালীন আচমকাই তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
নিহত মহিলার পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু বা আকস্মিক অসুস্থতা নয়; বরং জিজ্ঞাসাবাদের নামে পুলিশের লকআপে তাঁর ওপর অকথ্য থার্ড-ডিগ্রি টর্চার বা হেপাজতে নির্যাতন চালানো হয়েছে। পরিবারের এক সদস্য কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারাই আজ রক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে উঠেছে। দলিত ও প্রান্তিক হওয়ার কারণেই কি আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই?”
সিটের (SIT) বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকার সংগঠন এবং দলিত অধিকার রক্ষা কমিটিগুলির দাবি, এই ঘটনা স্পষ্টতই সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) চরম লঙ্ঘন। অভিযোগ উঠেছে যে, নিয়মের তোয়াক্কা না করে গভীর রাতে বা পর্যাপ্ত নারী পুলিশকর্মী ছাড়াই ওই মহিলাকে আটকে রেখে জেরা করা হচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় স্তরে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা শুরু হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে এই ‘পুলিশি বর্বরতা’র বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁদের মতে, সিট বা বিশেষ তদন্তকারী দলের মতো উচ্চপর্যায়ের এজেন্সির তত্ত্বাবধানে যদি এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে সাধারণ মানুষের আইনি ব্যবস্থার ওপর থেকে ভরসা সম্পূর্ণ উঠে যাবে।
বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি ও রাজনৈতিক পারদ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলিত অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা ধর্ণা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছেন। বিক্ষোভকারীদের সাফ দাবি, অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিক ও সিটের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অবিলম্বে বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের (SC/ST Act) অধীনে হত্যা মামলা রুজু করতে হবে।
একই সাথে, সরকারের কোনো দলীয় বা বিভাগীয় তদন্তের ওপর আস্থা না রেখে, হাইকোর্টের একজন বর্তমান বিচারপতির অধীনে উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্তের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে। এই নিয়ে বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে বর্তমান রাজ্য সরকারকে চেপে ধরার কৌশল নিচ্ছে বিরোধী দলগুলি।
প্রশাসনের অবস্থান ও পরবর্তী আইনি লড়াই
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিলেও, এখনও পর্যন্ত কোনো বড়সড় শাস্তিমূলক পদক্ষেপের খবর মেলেনি। তবে পুলিশের একটি মহলের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আপাতত অন্ধ্রপ্রদেশের এই দলিত মহিলার মৃত্যুর ঘটনাটি ধর্মীয়, সামাজিক এবং মানবাধিকার— সব দিক থেকেই দেশজুড়ে এক তুমুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন, প্রশাসন কি সত্যিই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেবে, নাকি বরাবরের মতো এই ঘটনাকেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে? সমগ্র পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
- NHRC seeks reports on Sai Krishna custodial death – এই ভিডিওটি অন্ধ্রপ্রদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অপর একটি চাঞ্চল্যকর পুলিশি হেপাজতে মৃত্যুর ঘটনা এবং মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) পদক্ষেপকে তুলে ধরে, যা এই রাজ্যের পুলিশি ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে সাহায্য করবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

