মুর্শিদাবাদে মেয়ের ইভটিজারকে কলার ধরে সোজা থানায় টেনে নিয়ে গেলেন প্রতিবাদী মা

মুর্শিদাবাদে মেয়ের ইভটিজারকে কলার ধরে সোজা থানায় টেনে নিয়ে গেলেন প্রতিবাদী মা

কলকাতা, ১৩ আগস্ট:

রাস্তায় ঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করা বা ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা বর্তমানে সমাজের একটি অন্যতম বড় ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বহু কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের এই ধরনের অনভিপ্রেত ও অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অহেতুক ভয়, লোকলজ্জা বা সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে আক্রান্তরা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চুপ করে থাকেন। কিন্তু এবার এই চিরাচরিত নীরবতা ভেঙে এক অভূতপূর্ব ও দৃষ্টান্তমূলক সাহসিকতার নিদর্শন গড়লেন মুর্শিদাবাদের এক প্রতিবাদী মা। নিজের চোখের সামনে মেয়েকে উত্যক্ত হতে দেখে তিনি বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে সোজা রুখে দাঁড়ালেন। শুধু মৌখিক প্রতিবাদ বা দূর থেকে বকাবকিতেই তিনি থেমে থাকেননি, প্রকাশ্য রাস্তায় অভিযুক্ত ওই ইভটিজারের জামার কলার সজোরে চেপে ধরে তাকে আক্ষরিক অর্থেই টেনে হিঁচড়ে সোজা স্থানীয় থানায় নিয়ে গেলেন ওই সাহসী মহিলা। মুর্শিদাবাদ জেলার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গোটা রাজ্য জুড়ে ওই মায়ের সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় এবং বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই ওই ছাত্রীকে রাস্তায় যাতায়াতের পথে নানাভাবে উত্যক্ত করছিল অভিযুক্ত যুবক। প্রতিদিনের মতো ঘটনার দিনও ওই কিশোরী যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আচমকাই তাকে লক্ষ্য করে ফের অশালীন মন্তব্য ও নানা ধরনের কুরুচিকর কটূক্তি করতে শুরু করে ওই যুবক। কিন্তু সেদিন ওই কিশোরী একা ছিল না, তার সঙ্গে তার মা-ও উপস্থিত ছিলেন। নিজের মেয়ের প্রতি এক অচেনা যুবকের এই ধরনের প্রকাশ্য অশালীন আচরণ এবং ক্রমাগত মানসিক হেনস্থা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি ওই মা। মুহুর্তের মধ্যে তিনি এক তীব্র রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। আশপাশের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে ওই যুবকের দিকে তেড়ে যান এবং তার জামার কলার শক্ত করে চেপে ধরেন। আকস্মিক এই প্রবল প্রতিবাদে ঘাবড়ে গিয়ে যুবক পালানোর চেষ্টা করলেও, ওই মায়ের হাতের শক্ত মুঠি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় সে।

রাস্তার ঠিক মাঝখানে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে উপস্থিত পথচারী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা হতবাক হয়ে যান। সচরাচর এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ অহেতুক আইনি ঝামেলা এড়াতে পাশ কাটিয়ে চলে যান অথবা নিছক নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ওই মায়ের রণচণ্ডী মূর্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতা দেখে উপস্থিত জনতাও শেষ পর্যন্ত তাঁকে সমর্থন যোগাতে শুরু করেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সাহায্যে এবং সম্পূর্ণ নিজের একক সাহসে ভর করে ওই মহিলা অভিযুক্ত ইভটিজারকে কলার ধরে টানতে টানতে একেবারে সোজা নিয়ে যান এলাকার স্থানীয় থানায়। সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ আধিকারিকরাও একজন সাধারণ গৃহবধূর এই রণচণ্ডী মূর্তি এবং একজন অপরাধীকে একেবারে হাতেনাতে ধরে আনার দৃশ্য দেখে প্রাথমিকভাবে রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যান।

থানায় পৌঁছে ওই প্রতিবাদী মা অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে বিস্তারিতভাবে অভিযোগ জানান। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আর বিন্দুমাত্র কালবিলম্ব না করে অভিযুক্ত যুবককে তৎক্ষণাৎ নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং পরবর্তী কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকাশ্য রাস্তায় মহিলাদের শ্লীলতাহানি, কটূক্তি বা উত্যক্ত করার মতো সামাজিক অপরাধ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনের নির্দিষ্ট ও কঠোর ধারায় মামলা রুজু করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে ওই পরিবারকে পূর্ণ আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

মুর্শিদাবাদ এবং পার্শ্ববর্তী নদিয়া জেলার বিভিন্ন স্তরে এই অভাবনীয় ঘটনাটি বর্তমানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সমাজতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সকলেই দৃঢ়ভাবে মনে করছেন যে এই মায়ের প্রতিবাদী রূপ সমাজের অন্য সমস্ত মহিলাদের কাছে এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। চুপ করে অন্যায় সহ্য করার দিন যে সত্যিই এবার শেষ হয়ে আসছে, মুর্শিদাবাদের এই ঘটনাই তার অন্যতম জ্বলন্ত প্রমাণ। ইভটিজারদের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি এবং অকুতোভয় পদক্ষেপ আগামী দিনে সমাজে নারী নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে এবং অপরাধীদের মনে ভয়ের সঞ্চার করবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply