নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই: নিট (NEET-UG) পরীক্ষা ঘিরে লাগাতার অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র ঐতিহাসিক প্রতিবাদের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দেশের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই অভূতপূর্ব ছাত্র বিক্ষোভ এবং তার পরিণতিতে এক শীর্ষ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ইস্তফার ঘটনা এবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো বিশ্বের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলি ভারতের এই ছাত্র অভ্যুত্থান এবং সিজেপি-র রাজনৈতিক ভূমিকার ওপর বিশেষ আলোকপাত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে কীভাবে সামান্য একটি ছাত্র আন্দোলন ও রাজপথের নাগরিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভারতের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রশাসনের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিল। রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের রাজধানীতে এত বিপুল স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন দেখা যায়নি। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে সিজেপি-র মতো যুব শিবিরের অদম্য জেদের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর এই ইস্তফাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক জয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক মহল।
আল জাজিরা ও বিবিসি: সিজেপি-র চার দফা দাবি ও পুলিশি তাণ্ডব
আল জাজিরার বিশেষ বিশ্লেষণে জোর দেওয়া হয়েছে সিজেপি (CJP)-র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলির ওপর। আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত ইস্তফা, প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী ও আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুক সহ আটক সমস্ত আন্দোলনকারীদের অবিলম্বে মুক্তি, ক্ষতিগ্রস্ত নিট পরীক্ষার্থীদের উপযুক্ত আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পুলিশি এফআইআর (FIR) না দায়ের করার যে চার দফা দাবি সিজেপি উত্থাপন করেছিল— আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি সেগুলিকে অত্যন্ত যৌক্তিক ও শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, বিবিসি-র বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি তাণ্ডব, টিয়ার গ্যাস প্রয়োগ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পরও সিজেপি-র কর্মী ও তরুণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে অনমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন, তা কেন্দ্র সরকারের ওপর অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। শত প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও রাজপথ না ছাড়ার এই মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধানকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি।
দ্য গার্ডিয়ান ও নিউ ইয়র্ক টাইমস: সরকারের ভাবমূর্তিতে বিরাট আঘাত
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, সিজেপি-র এই অনমনীয় অবস্থানের দরুণ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রকৃতপক্ষে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধাক্কা। শিক্ষা ক্ষেত্রের চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় যে কেবল কথার জালে এড়ানো সম্ভব নয়, ছাত্রসমাজ তা নিশ্চিত করে ছেড়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে সিজেপি-র আন্দোলনের অভিনব কৌশল ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এড-টেক ইনফ্লুয়েন্সার ও অনলাইন শিক্ষকরা যেভাবে সিজেপি-র দাবির সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন, তা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবাসী ভারতীয় ও বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর কাড়তে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশ মনে করছে, যন্তর মন্তরে আন্দোলন দমনে পুলিশি পদক্ষেপ যেভাবে বিশ্বের দরবারে ভারতের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করছিল, তা রুখতেই কেন্দ্র ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাল।
রয়টার্স: যুবরাজনীতিতে নতুন দিনের বার্তা
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কভারেজে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফেরানোর বার্তা দিয়ে মন্ত্রী পদত্যাগ করলেও, বাস্তবে সিজেপি-র টানা গণআন্দোলনই এই ইস্তফার আসল কারণ। বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলি একযোগে একমত প্রকাশ করেছে যে, নিট কেলেঙ্কারি এবং তার প্রেক্ষিতে সিজেপি-র এই ঐতিহাসিক সাফল্য ভারতের যুবরাজনীতি ও তরুণ প্রজন্মের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক নতুন ও দূরগামী অধ্যায় সূচিত করল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
