গুয়াহাটি, ২৬ জুলাই: অসম সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর কন্যার মোদী-বিরোধী স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্বের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্ক ও রাজনৈতিক ঝড় তৈরি হয়েছে। বিরোধী শিবির থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের অন্দরেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র গুঞ্জন ও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সমস্ত জল্পনা ও বিতর্কের মাঝে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদান করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কোনো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদের পিতা-মাতাকে কোনোভাবেই দায়ী করা বা জবাবদিহি করানো অনুচিত।
প্রাপ্ত তথ্য ও সংবাদসূত্র অনুযায়ী, মন্ত্রীর কন্যা সম্প্রতি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন, যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নীতির তীব্র বিরোধিতা করে সোচ্চারভাবে স্লোগান দিতে দেখা যায় তাঁকে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিজেপি ও অসম রাজ্য সরকারকে তীব্র নিশানা করতে শুরু করে। বিশেষ করে, যেখানে ক্ষমতাসীন দল প্রতিনিয়ত দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে, সেখানে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীর নিজের ঘরের সদস্যেরই এমন প্রকাশ্য মোদী-বিরোধী অবস্থান বিজেপিকে বেশ খানিকটা রাজনৈতিক অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই রাজ্য রাজনীতির পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে যায়। বিরোধী দলগুলি এই সুযোগে তোপ দেগে অভিযোগ করতে শুরু করে যে, স্বয়ং শাসকদলের শীর্ষ মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যরাই যখন প্রধানমন্ত্রী মোদীর গৃহীত নীতি ও শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে এই সরকারের কী বার্তা পৌঁছচ্ছে? বিরোধী নেতৃত্বের একাংশ দাবি তোলে, মন্ত্রীকে অবশ্যই নিজের পরিবারের এই ধরণের প্রকাশ্য অবস্থানের জন্য নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে এবং মুখ্যমন্ত্রীর উচিত এই বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সামাজিক মাধ্যমেও এই খবরটি ছড়ানোর পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও ব্যক্তির নিজস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে মন্তব্য করলেও, শাসকদলের ক্যাডার ও সমর্থকদের বড় অংশ বিষয়টিতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তৈরি হওয়া চরম অস্বস্তির জবাব দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও স্পষ্টবাদী অবস্থানের পরিচয় দিয়েছেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, প্রতিটি স্বাধীন নাগরিকের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, “একজন সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও আদর্শগত অবস্থান তৈরি হতে পারে। সেই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সেই ব্যক্তির নিজের। সন্তানের রাজনৈতিক কাজ বা স্লোগানের জন্য তাঁর মা-বাবা কিংবা অভিভাবককে দায়ী করা রাজনৈতিকভাবে অনুচিত ও অন্যায্য।”
হিমন্ত আরও যুক্ত করেন যে, অসমে কোনো ব্যক্তি নিজের মতামত ব্যক্ত করলে তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত একতিয়ারভুক্ত। দলীয় রাজনীতিতে পরিবারকে টেনে এনে আক্রমণ করার যে প্রবণতা বিরোধীরা দেখাচ্ছেন, তা সুস্থ রাজনীতির পরিচয় নয় বলেও তিনি বার্তা দেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের ফলে বিজেপি ও রাজ্য সরকার কিছুটা হলেও রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে পারিবারিক রাজনীতির বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত বাকস্বাধীনতার বিষয়টি উঠে আসছে, অন্যদিকে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতাদের পারিবারিক অবস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও চর্চা চলছে। মন্ত্রীর কন্যা নিজের অবস্থান নিয়ে এখনো পর্যন্ত নতুন কোনো বিবৃতি না দিলেও, ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করল।
সব মিলিয়ে, বিরোধী দলগুলো যখন এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে সরকার ও শাসকদলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি বিতর্কের আগুনে কিছুটা হলেও জল ঢালল। আগামী দিনে এই ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে আর কোনো নতুন মোড় নেয় কি না, সে দিকেই নজর রাখছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ মহল।,
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
