লখনউ, ১৯ জুলাই: উত্তরপ্রদেশের রামপুরে সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা আজম খানের সাধের ‘মোহাম্মদ আলি জোহর বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ৩৮টি ভবন ভেঙে ফেলার নোটিস ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যোগী সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ওয়াইসির অভিযোগ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) চায় না যে মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক।
রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভবনকে ‘অবৈধ’ ও ‘বিনা অনুমতিতে নির্মিত’ বলে চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশিকা সামনে আসতেই উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন বিরোধী শিবিরের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেন, “বিজেপি সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও উন্নয়নের পরিকাঠামো ধ্বংস করতে চাইছে। তারা মুখে বড় বড় কথা বললেও, বাস্তবে মুসলিম ঘরের ছেলেমেয়েরা বিশেষত কন্যারা যাতে শিক্ষিত হতে না পারে, সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে।” ওয়াইসির মতে, জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কম খরচে শিক্ষার আলো দিচ্ছিল, তাকে এভাবে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা আসলে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত অগ্রগতিকে রুখে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
তিনি আরও যোগ করেন, বহু বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্রেফ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে বুলডোজারের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এই আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে আদালত যাতে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করে, সেই আবেদনও জানান বিরোধীরা।
রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) ভাইস-চেয়ারপারসন তথা রামপুরের জেলাশাসক অজয় কুমার দ্বিবেদী উত্তরপ্রদেশ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন আইন, ১৯৭৩-এর ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টকে নোটিস পাঠিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই ৩৮টি ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা বা ‘বিল্ডিং প্ল্যান’ পাস করানো হয়নি। এই অবৈধ নির্মাণগুলি সরিয়ে নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে মাত্র ১৫ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসন নিজেই বুলডোজার দিয়ে ভবনগুলি গুঁড়িয়ে দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এর পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের গণপূর্ত দফতর (পিডব্লিউডি) ক্যাম্পাসের ভেতরের প্রধান রাস্তাটিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাধারণ সড়ক হিসেবে ঘোষণা করে মূল ফটকে নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা ও ক্যাম্পাস চত্বরের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি পড়ুয়া ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
যদিও আরডিএ-র এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে জোহর বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট। শুনানির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যে সিগনখেরা গ্রামে এই সুবিশাল ক্যাম্পাসটি অবস্থিত, সেটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের আগে রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকার মধ্যেই ছিল না। সেই সময় ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার একক ক্ষমতা ছিল স্থানীয় জেলা পঞ্চায়েতের কাছে, যার অনুমোদন তাদের কাছে রয়েছে। ফলে নতুন করে আরডিএ-র নকশা অনুমোদনের প্রশ্নই ওঠে না।
২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সমাজবাদী পার্টির এই মুসলিম নেতার বিরুদ্ধে জমি দখল ও ইজারা আইন লঙ্ঘনের মতো একের পর এক ৮১টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে আজম খান রামপুর জেলে বন্দি রয়েছেন।
কেবল রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, যোগী প্রশাসনের এই নোটিসের কড়া নিন্দা করেছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডও (এআইএমপিএলবি)। বোর্ডের মুখপাত্র ডক্টর এস.কিউ.আর ইলিয়াস এক বিবৃতিতে বলেন, “স্থানীয় প্রশাসনের এই পদক্ষেপ চরম পক্ষপাতদুষ্ট, প্রতিহিংসামূলক এবং অন্যায়। ভারতের বহু পুরনো বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা আজকের যুগের আধুনিক নিয়মে তৈরি নয়, কিন্তু বেছে বেছে কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করা হচ্ছে।”
সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র জুহি সিং-ও এই নোটিসের তীব্র প্রতিবাদ করে জানিয়েছেন, সস্তার ফি-তে হাজার হাজার পড়ুয়া এখানে পঠনপাঠন চালাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এখন তুঙ্গে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

