নয়াদিল্লি, ১৯ জুলাই: লোকসভার বাদল অধিবেশন শুরুর ঠিক আগের দিনই জাতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন তোলপাড় শুরু হলো। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদকে নিয়ে গঠিত নতুন দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-কে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর পরই এই চরম রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর নতুন দলে মিশে যাওয়ার আবেদন বা দলত্যাগ বিরোধী আইনের আবেদনের ওপর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তার আগেই কেন্দ্রীয় সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু এনসিপিআই-এর লোকসভার দলনেতা হিসেবে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানালে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিরোধী শিবির। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কংগ্রেস ও তৃণমূল সহ সমগ্র ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট সর্বদলীয় বৈঠক থেকে প্রতীকী ওয়াকআউট করে।
সংসদ ভবনের অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে আয়োজিত এই প্রথামাফিক সর্বদলীয় বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু উপস্থিত ছিলেন। বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে কংগ্রেসের জয়রাম রমেশ, সমাজবাদী পার্টির ধর্মেন্দ্র যাদব এবং তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র অংশ নেন। তবে বৈঠকে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি দেখেই প্রবল আপত্তি তোলেন বিরোধী নেতারা।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “সংসদের টেবিল অফিসের তালিকা অনুযায়ী অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের মোট আসন সংখ্যা ২৮টি। এই ২০ জন দলত্যাগী সাংসদের অন্য দলে মিশে যাওয়ার আবেদন এখনও স্পিকার অনুমোদন করেননি। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২০টি দলত্যাগ বিরোধী পিটিশন এখনও ঝুলে রয়েছে। সংবিধানের ৯১তম সংশোধনীর পর সংসদে কোনো পৃথক ব্লকের স্বীকৃতি দেওয়ার নিয়ম নেই। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে সংসদীয় মন্ত্রী এই তথাকথিত এনসিপিআই দলকে আমন্ত্রণ জানালেন?” এই ঘটনার প্রতিবাদেই কংগ্রেস, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি, বামপন্থী ও আম আদমি পার্টি সহ গোটা বিরোধী জোট বৈঠক বয়কট করে বাইরে বেরিয়ে আসে।
তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের মুখে পড়েও নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। केंद्रीय সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু সরকারের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত বলে দাবি করেছেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এনসিপিআই-এর পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির আবেদন জানানো হয়েছে। একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনো দলের আবেদনকে সরকার কীভাবে অগ্রাহ্য করতে পারে? সংসদের সমস্ত দল এবং গোষ্ঠীর মতামত শোনা সরকারের দায়িত্ব, এবং সেই নিয়ম মেনেই এই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে।” রিজিজু আরও যোগ করেন যে, সংখ্যার ভিত্তিতে আলোচনা হলেও গণতন্ত্রে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। বিরোধীদের এই ওয়াকআউটকে তিনি একটি ‘প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং বাদল অধিবেশনে সব দলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
সর্বদলীয় বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ তথা বর্তমান এনসিপিআই নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তিনি আজ সম্পূর্ণ নতুন একটি দলের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, “বিগত ১৫ বছর ধরে আমি লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলনেতা ছিলাম। কিন্তু আজ আমি ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ার নেতা হিসেবে এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছি। দল বদলালেও আমরা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অখণ্ডতার আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসিনি। আমাদের এই ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা সংসদের ভেতরেও বজায় থাকবে।” লোকসভা সচিবালয় সূত্রের খবর, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি ড. কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নাম এই নতুন দলের চিফ হুইপ হিসেবে কেন্দ্রের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই বিক্ষুব্ধ ২০ জন সাংসদ নিজেদের পদ বাঁচাতে সংবিধানের দশম তফসিলের আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ত্রিপুরার এই নিবন্ধিত আঞ্চলিক দল এনসিপিআই-এর সাথে যুক্ত হওয়ার কৌশল নিয়েছেন। যেহেতু তারা তৃণমূলের মোট লোকসভা শক্তির (২৮ জন) দুই-তৃত্যাংশের বেশি, তাই তারা আইনি সুরক্ষার দাবি করছেন। লোকসভা সচিবালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ সার্কুলারে ইতিমধ্যেই এই ২০ জন সাংসদকে মূল তৃণমূল বেঞ্চ থেকে সরিয়ে পৃথক বসার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে এই সাংসদদের পদ খারিজের জন্য যে আবেদন জানিয়েছেন, তার ফয়সালা এখনও হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের এই ‘সবুজ সংকেত’ সংসদের বাদল অধিবেশনে যে এক চরম সংघातের পরিবেশ তৈরি করবে, তা বলাই বাহুল্য।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

