প্রশ্নপত্র ফাঁসে ১০ বছরের জেল ও ১০ কোটি টাকা জরিমানা: নতুন বিল অনুমোদন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের

প্রশ্নপত্র ফাঁসে ১০ বছরের জেল ও ১০ কোটি টাকা জরিমানা: নতুন বিল অনুমোদন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের

নয়াদিল্লি, ২৫ জুলাই: দেশের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে স্বচ্ছতা ফেরাতে নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় সরকার। দেশজুড়ে নিট (NEET) পরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতা এবং রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান উত্তাপের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। এবার থেকে যেকোনো সরকারি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের (Paper Leak) ঘটনায় যুক্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার কঠোর শাস্তি সুনিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত বিলে সায় দিয়েছে ক্যাবিনেট।

সংবাদসংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘পাবলিক একজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) অ্যাক্ট, ২০২৪’-এর সংশোধনী খসড়া বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সাথে কোনো সমঝোতা নয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংশোধনী বিলটি সংসদে পেশ করা হবে।

প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়ায় অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে পাশ হওয়া আগের আইনে তিন থেকে পাঁচ বছরের সাজা এবং সর্বনিম্ন ১ কোটি টাকা জরিমানার নিয়ম রাখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে অপরাধিদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন জেল হেফাজতের মেয়াদ ৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর করা হয়েছে। আর সংগঠিত চক্র বা পেশাদার চক্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলে দোষীদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিশেষ আইনি ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত কয়েক মাসে একের পর এক সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এই আইন পাস হলে তা অনেকটাই রোখা সম্ভব হবে। পরীক্ষায় জালিয়াতি, জাল ওয়েবসাইট তৈরি কিংবা ওএমআর (OMR) শিট কারচুপির মতো ১৫টি অপরাধকে এই কঠোর আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

শুধুমাত্র কঠোর শাস্তিই নয়, অপরাধের বিচার যাতে বছরের পর বছর ঝুলন্ত অবস্থায় না থাকে, তার জন্য এক বিশেষ আইনি কাঠামোর ব্যবস্থা করছে কেন্দ্র। খসড়া বিল অনুযায়ী, এই ধরনের অনিয়মের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ (Fast-track Court) বা দ্রুত আদালত গঠন করা হবে। এই ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতগুলোকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে, যাতে তদন্ত শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা নিশ্চিত করা যায়।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই কঠোর সিদ্ধান্তের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সোশাল মিডিয়ায় এক বার্তায় স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

একদিকে দিল্লির রাজপথে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) ও সোনাম ওয়াংচুকের সমর্থনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেমন তুঙ্গে, অন্যদিকে সংসদের অন্দরে বিরোধী দলগুলোও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছে। এই আবহেই ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে শাসকদল।

সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলোকে বিঁধে বলেছেন, “শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিলে কোনো বিলম্ব না করার বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো লোকসভায় এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে কেবল গোলমাল চালিয়ে যেতে চায়। ছাত্রসমাজ তাদের এই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট বুঝতে পারছে।” সরকারপক্ষ থেকে বিরোধী নেতাদের কাছে আর্জি জানানো হয়েছে, যাতে তারা সংসদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দেন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এই বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস করতে সাহায্য করেন।

নতুন এই আইনে কঠোরতার পাশাপাশি আসল পরীক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে রাখা হয়েছে। বিলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অনিয়মে যে সমস্ত বড় বড় গ্যাং, সংগঠিত চক্র, কোচিং সংস্থা বা অসাধু আধিকারিকরা আর্থিক ফায়দা তোলার জন্য যুক্ত থাকবে, মূলত তাদেরকেই এই আইনের কঠোরতম আওতায় আনা হবে। সাধারণ পরীক্ষার্থীরা যাতে অনর্থক আইনি হেনস্থার শিকার না হন, তার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচও বিলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই বিলটি লোকসভায় উত্থাপন হতে চলেছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply