নয়াদিল্লি, ২৫ জুলাই: রাজধানীর জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন এবং আমরণ অনশনের ২৬তম দিনে এসে অনশন ভঙ্গ করার পর বিতর্ক এড়াতে এবার সোশাল মিডিয়ায় মুখ খুললেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুক। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর অনশন তুলে নিলেও, নেটিজেনদের একাংশের তোলা “সরকারের সাথে গোপন আঁতাত” বা “রফা” করার অভিযোগ এক বাক্যে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। উল্টে শুক্রবার গভীর রাতে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক অভিযোগ করেন, আন্দোলনের ওপর লাদাখের মতো নির্মম দমনপীড়ন এবং ব্যাপক হিংসা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাতেই তিনি তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে অনশন ভঙ্গ করা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। সেই সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে সোনাম ওয়াংচুক স্পষ্ট জানিয়েছেন, “যাঁরা বলছেন আমি সরকারের সাথে কোনো রফা (Deal) করেছি, তাঁরা আমার পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত নন। আমার যদি কোনো সমঝোতাই করার থাকত, তবে কি আমি টানা ২৬ দিন না খেয়ে নিজের শরীর ধ্বংস করতাম?”
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৮ জুলাই তাঁকে জোরপূর্বক সাফদারজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কার্যত এক “বন্দির মতো” আচরণ করা হয়েছিল। তাঁর চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কোনো দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
নিজের অনশন ভঙ্গের আসল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওয়াংচুক উল্লেখ করেন ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে লাদাখে আন্দোলনকারী যুবকদের ওপর পুলিশ ও সিআরপিএফ-এর নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা। তিনি বলেন, “দিল্লির রাজপথে ও জন্তর মন্তরে যেভাবে পুলিশি তৎপরতা বাড়ছিল, তাতে আমার মনে হয়েছিল যেকোনো মুহূর্তে হাজার হাজার নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের ক্র্যাকডাউন চালানো হতে পারে। লাদাখের সেই রক্তক্ষয়ী স্মৃতি আমাকে তাড়া করছিল। আমি চেয়েছিলাম শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই শারীরিক আক্রমণ বা আইনি হয়রানির শিকার না হয়। তাই রক্তপাত এড়াতে ও শান্তি বজায় রাখতে আমি অবিলম্বে অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিই।”
দীর্ঘ দরকষাকষির পর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে যে তিনটি মূল বিষয়ে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি অনশন ভাঙেন, সেগুলি হল:
- শিক্ষার্থীদের ওপর আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা: জন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বা সংসদ ভবনের দিকে মিছিলে যোগ দেওয়া কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর (FIR) বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।
- সংসদে দীর্ঘ আলোচনা: প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার নিয়ে দেশের সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও বিল উপস্থাপন করা হবে।
- ক্ষতিপূরণের বিবেচনা: বিতর্কিত নিট (NEET) পরীক্ষার অনিয়ম ও মানসিক চাপে যে সমস্ত শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে সরকার।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তবে অনশন প্রত্যাহারের আলোচনায় এই দাবি থেকে পিছু হঠার প্রশ্নে ওয়াংচুক বলেন, “আমার মূল অগ্রাধিকার ছিল ছাত্রদের জীবন ও তাঁদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। তাদের নামে আইনি মামলা রুজু ঠেকানোই আমার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল। ব্যক্তিগতভাবে মন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য অনশন দীর্ঘায়িত করা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি, তবে আন্দোলনকারী যুবসমাজ এই দাবি থেকে পিছিয়ে আসবে না এবং সময়ের সাথে সাথে মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতেই হবে।”
যদিও সোনাম ওয়াংচুক অনশন তুলে নিয়েছেন, তবুও দিল্লির রাজপথে সিজেপি (Cockroach Janta Party) সমর্থিত শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থামছে না। সংগঠকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেও শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবিরত চলবে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

