সংসদের বাদল অধিবেশনে ৫টি নতুন বিল আনছে কেন্দ্র, সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল নিয়ে জারি চরম ধোঁয়াশা

সংসদের বাদল অধিবেশনে ৫টি নতুন বিল আনছে কেন্দ্র, সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল নিয়ে জারি চরম ধোঁয়াশা

নয়াদিল্লি, ১৭ জুলাই: আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের হাইভোল্টেজ বাদল অধিবেশনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। আসন্ন এই অধিবেশনে পেশ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে ৫টি নতুন বিলের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে লোকসভা সচিবালয়ের পক্ষ থেকে যে সাময়িক কার্যতালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে স্থান পায়নি অত্যন্ত বিতর্কিত ও বহুল চর্চিত লোকসভা আসন বা কেন্দ্রের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত বিল (Delimitation Bill)। ফলে এই বিলটি এই অধিবেশনে শেষ পর্যন্ত পেশ করা হবে কি না, তা নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে চরম ধোঁয়াশা এবং সাসপেন্স তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলটি নিয়ে মোদী সরকারের অন্দরে এখনও গভীর কৌশলগত আলোচনা চলছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে বিশেষ অধিবেশনে এই বিলটি এবং নারী সংরক্ষণ বিলকে একসঙ্গে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল হিসেবে পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু লোকসভায় প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মেলায় তৎকালীন সময়ে বিলটি পাস করানো সম্ভব হয়নি।

তবে রাজনৈতিক সমীকরণ গত কয়েক মাসে অনেকটাই বদলে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের বড়সড় ভাঙন এবং রাজ্য রাজনীতিতে ক্ষমতার রদবদলের ফলে লোকসভা ও রাজ্যসভা উভয় কক্ষেই ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) তথা এনডিএ (NDA)-র অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার ব্যবধান এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তা সত্ত্বেও সাময়িক তালিকায় এই বিলের অনুপস্থিতি বিরোধী শিবিরকে নতুন করে রণকৌশল সাজানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। যদিও ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, তালিকায় না থাকলেও সরকার চাইলে অধিবেশন চলাকালীন যেকোনো সময় বিশেষ ক্ষমতাবলে এই বিলটি টেবিলে উত্থাপন করতে পারে।

তালিকায় থাকা ৫টি নতুন বিলের খুঁটিনাটি

বাদল অধিবেশনে যে ৫টি নতুন বিল আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি সামাজিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিলগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • জাতীয় সম্মানহানি প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল, ২০২৬: এই বিলটির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মূল আইনটিকে সংশোধন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারতের জাতীয় গীতি ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সময় যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করেন বা বাধা সৃষ্টি করেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
  • জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন (সংশোধনী) বিল: এই বিলের মাধ্যমে দেশে জন্ম ও মৃত্যুর বিলম্বিত নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন আরও কঠোর ও সুনির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
  • আয়কর (সংশোধনী) বিল, ২০২৬: দেশের সার্বভৌম ঋণ বাজারকে আরও গভীর করতে এবং আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে একটি অধ্যাদেশকে প্রতিস্থাপন করতে এই বিলটি আনা হচ্ছে।
  • সুপ্রিম কোর্ট (বিচারক সংখ্যা) সংশোধনী বিল, ২০২৬: দেশের শীর্ষ আদালতে বিচারক নিয়োগ ও সংখ্যাগত ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার লক্ষ্যে এই বিলটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
  • ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬: এই বিলের মূল লক্ষ্য হলো এমএসএমই (MSME) খাতের বকেয়া অর্থপ্রদান প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও দ্রুততর করা এবং রাজ্যগুলিকে আরও নমনীয়তা প্রদান করা।

আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের পাশাপাশি ১৩০তম সংবিধান সংশোধনী বিলটিও এই তালিকায় জায়গা পায়নি। এই বিলটিতে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী বা কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ যেকোনো জনপ্রতিনিধি যদি ৩০ দিনের বেশি সময় জেলে বন্দি থাকেন, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর পদ খারিজ হয়ে যাবে। ২০২৫ সালে এটি পেশ হওয়ার পর তীব্র বিতর্কের মুখে তা যৌথ সংসদীয় কমিটিতে (JPC) পাঠানো হয়েছিল।

নতুন ৫টি বিলের পাশাপাশি পূর্ববর্তী অধিবেশনগুলোতে আটকে থাকা দুটি পুরোনো বিলও এই অধিবেশনে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিল বা এফসিআরএ (FCRA) বিল এবং ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫’।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তিন সপ্তাহের এই বাদল অধিবেশনে সরকারের এই বিল পাশের চেষ্টা এবং বিরোধীদের পালটা প্রতিরোধে সংসদের আবহ উত্তপ্ত হতে বাধ্য। আসন পুনর্নির্ধারণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তামিলনাড়ুর ডিএমকে বা অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি কী ভূমিকা নেয়, এখন সেটাই দেখার।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply