নয়াদিল্লি, ২২ জুলাই: জাতীয় রাজধানীতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশের কথিত তাণ্ডব ও বলপ্রয়োগের ঘটনায় শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে দায়ের করা মামলায় চরম ধাক্কা খেল আবেদনকারীরা। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই সংক্রান্ত আবেদনের জরুরি ভিত্তিতে শুনানি করতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করেছে। আদালতে পেশ করা তথাকথিত পুলিশের বর্বরতামূলক ভিডিও দেখতেও সরাসরি অস্বীকৃতি জানান প্রধান বিচারপতি। বিচারপতির মন্তব্য, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না, আপনার নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না। আমরা কোনও ভিডিও দেখতে আগ্রহী নই এবং সেগুলির জন্য আমাদের হাতে সময় নেই।”
বুধবার সকালে দেশের শীর্ষ আদালতের কাজ শুরু হতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনকে নিয়ে গঠিত তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে বিষয়টি উত্থাপন করেন এক আইনজীবী। আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী আদালতকে আর্জি জানান, গত ২০ জুলাই দিল্লির রাজপথে আন্দোলনরত হাজার হাজার পড়ুয়ার ওপর পুলিশ যেভাবে লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করেছে, তার বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত (Suo Motu) মামলা গ্রহণ করা উচিত।
আইনজীবী সওয়াল করার চেষ্টা করেন যে, ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র ব্যানার তলে সমবেত ছাত্ররা জাতীয় গুরুত্ব সম্পন্ন একাধিক দাবি তুলছিল। বিশেষ করে নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র (NTA) আমূল সংস্কারের দাবিতে কয়েক মাস ধরে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তবে আইনজীবী তাঁর বক্তব্য শেষ করার আগেই প্রধান বিচারপতি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
আইনজীবী দমে না গিয়ে পুনরায় আদালতকে জানান যে, ঘটনার দিন পুলিশের চরম বলপ্রয়োগ ও ছাত্রদের ওপর আঘাত হানার একাধিক ভিজ্যুয়াল এবং ভিডিও সিসিটিভি ফুটেজ তাঁর কাছে সংরক্ষিত আছে। আদালত চাইলে তিনি তা প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে প্রস্তুত। এর জবাবে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “আমরা ভিডিও দেখার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই। এসব দেখার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আদালতের মূল্যবান সময় এভাবে নষ্ট করবেন না।” আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ও কড়া মনোভাবের পর তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
চলতি বছরের মে মাসে অপর একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে গড়ে উঠেছিল এই ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। কর্মসংস্থানহীন যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারিত একটি শব্দ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কয়েক মাসের মধ্যে সমাজমাধ্যমে লাখ লাখ অনুগামী লাভ করে সংগঠনটি। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে গত এক মাস ধরে তারা লাগাতার ধর্না আন্দোলন চালিয়ে আসছে। প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকও এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আমরণ অনশনে অংশ নিয়েছিলেন।
গত সোমবার (২০ জুলাই) পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুর দিনে আন্দোলনকারীরা ‘সংসদ চলো’ অভিযানের ডাক দেয়। অভিযোগ, সংসদ অভিমুখে মিছিল এগোনোর চেষ্টা করতেই দিল্লি পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বহু শিক্ষার্থী আহত হন এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খাওয়ার ঠিক একদিন আগেই দিল্লি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায়ের বেঞ্চও একই ধরনের একটি আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকার করেছিল। হাই কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, “আদালতকে এর মধ্যে টানবেন না।” এদিকে এই ঘটনা কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিরোধীরাও সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে রাজপথে নেমেছে।
শীর্ষ আদালত এবং হাই কোর্ট উভয় জায়গাতেই জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ হওয়ায় এখন নিয়মিত তালিকার মাধ্যমেই এই মামলার আইনি ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগের এই কঠোর অবস্থান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আইনি লড়াইয়ে যে একটি বড়সড় সেটব্যাক বা ধাক্কা দিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
