কলকাতা: একবিংশ শতাব্দীর জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে এখন ‘সবুজ জ্বালানি’ বা ‘বায়োফুয়েল’ (Biofuel)-এর জয়জয়কার। বিশেষ করে পেট্রোলের সাথে ইথানল মিশ্রণ (Ethanol Blending)-এর প্রক্রিয়াকে খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলি ইতিমধ্যেই পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের (E20) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুঁয়ে ফেলেছে, যা অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।
কিন্তু পরিবেশের স্বার্থে যে ইথানলকে মহৌষধ ভাবা হচ্ছে, তার আড়ালে কি কোনো নতুন বিপর্যয় লুকিয়ে আছে? বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গভীর অনুসন্ধান এবং জীবনচক্র বিশ্লেষণ (Life-Cycle Analysis) বলছে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে পরিবেশবান্ধব মনে হলেও, এর উৎপাদন এবং প্রয়োগ পদ্ধতি পরোক্ষভাবে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করছে। বিভিন্ন সংবাদ পত্রিকার অনুসন্ধানে উঠে এলো ইথানল ব্যবহারের অন্ধকার দিকগুলি।
১. গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন ও ধোঁয়াশা: বায়ুমানের নতুন সংকট
পেট্রোলের সাথে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি পুড়লে গাড়ি থেকে কার্বন মনোক্সাইড (CO) এবং হাইড্রোকার্বনের নির্গমন কিছুটা হ্রাস পায় ঠিকই, তবে এটি সামগ্রিক বায়ু দূষণ রোধ করতে পারে না। মার্কিন শক্তি তথ্য প্রশাসন (US EIA, 2026)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির বাষ্পীভবন হার (Evaporative Emissions) সাধারণ পেট্রোলের চেয়ে অনেক বেশি।
গরমের দিনে ফুয়েল ট্যাঙ্ক এবং রিফুয়েলিং স্টেশন থেকে উদ্বায়ী জৈব যৌগ (VOCs) এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) দ্রুত বাতাসে মিশে যায়। সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে এই রাসায়নিকগুলি বিক্রিয়া করে ‘গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন’ (Ground-level Ozone) এবং বিষাক্ত ধোঁয়াশা (Smog) তৈরি করে। এই ওজোন স্তর ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি, ইথানল দহনের ফলে ফরমালডিহাইড এবং অ্যাসিটালডিহাইডের মতো ক্ষতিকারক কার্বনিল (Carbonyls) যৌগের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. জলের বিপুল অপচয় ও ‘ইউট্রোফিকেশন’-এর থাবা
ইথানল সরাসরি প্রাকৃতিতে উৎপন্ন হয় না; এটি মূলত ভুট্টা, আখ কিংবা ভাঙা শস্যদানা ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক লিটার আখভিত্তিক ইথানল তৈরি করতে প্রায় ২,৮৬০ লিটার জলের প্রয়োজন হয়। ভারত বা আমেরিকার মতো দেশে যেখানে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নামছে, সেখানে ইথানল উৎপাদনের জন্য শস্য চাষ করতে গিয়ে পানির উৎসের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিপদ শুধু জলের অপচয়েই সীমাবদ্ধ নয়। ইথানলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ফসলের ফলন বাড়াতে জমিতে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসযুক্ত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। বৃষ্টির জলের সাথে এই সার ধুয়ে যখন স্থানীয় নদী বা জলাশয়ে মেশে, তখন সেখানে ‘ইউট্রোফিকেশন’ (Eutrophication) ঘটে। জলাশয়ে অতিরিক্ত পুষ্টির কারণে শৈবালের মাত্রাতিরিক্ত বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা জলের সমস্ত অক্সিজেন শুষে নেয়। ফলস্বরূপ, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়, যা সম্পূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

৩. পরোক্ষ গ্রিনহাউস গ্যাস ও ‘কার্বন ঋণ’-এর ফাঁদ
তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, ইথানল তৈরির গাছগুলি বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) শোষণ করে, তাই এটি পুড়লে বায়ুমণ্ডলে নতুন কোনো কার্বন যোগ হয় না। কিন্তু সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জীবনচক্র বিশ্লেষণে (Life-Cycle Analysis) এক ভিন্ন সত্য প্রকাশ পেয়েছে।
ইথানল উৎপাদনের জন্য জমি তৈরি করা, ট্র্যাক্টর চালানো, রাসায়নিক সার প্রস্তুত করা এবং পরিশেষে রিফাইনারিতে উচ্চ তাপমাত্রায় পাতন (Distillation) প্রক্রিয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লা পোড়াতে হয়। এর চেয়েও বিপজ্জনক হলো ‘পরোক্ষ ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন’ (Indirect Land Use Change)। ইথানলের বাণিজ্যিক চাহিদা মেটাতে যখন নতুন জমি খোঁজা হয়, তখন বহু ক্ষেত্রে চারণভূমি বা বনাঞ্চল কেটে সাফ করা হয়। বন উজাড় করার ফলে মাটির নিচে এবং গাছে জমা থাকা শত শত বছরের পুরনো কার্বন এক লহমায় বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘কার্বন ঋণ’ (Carbon Debt)। এই কার্বন ঋণ শোধ করতে একটি ইথানল প্রকল্পের কয়েক দশক বা শত বছর সময় লেগে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হ্রাসের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেয়।
৪. জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং মনোকালচার কৃষির আগ্রাসন
ইথানলের উচ্চ চাহিদার কারণে কৃষকরা এখন খাদ্যশস্যের বদলে কেবল জ্বালানি উৎপাদনের উপযোগী ফসল চাষে বেশি ঝুঁকছেন। এর ফলে কৃষিক্ষেত্রে ‘মনোকালচার’ (Monoculture) বা একক ফসল চাষের প্রবণতা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। বছরের পর বছর একই জমিতে ভুট্টা বা আখের মতো ফসল চাষ করায় মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও পুষ্টিগুণ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রাকৃতিক বনাঞ্চল বা বিচিত্র ফসলের মাঠ যখন বিশাল আখের ক্ষেতে রূপান্তরিত হয়, তখন স্থানীয় পশুপাখি, কীটপতঙ্গ এবং অণুজীবরা তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারায়। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতি প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিচ্ছে।
৫. বিষাক্ত বর্জ্য বা ‘ভিনাস’ (Vinasse)-এর দূষণ
ইথানল ডিস্টিলারি বা শোধনাগারগুলি থেকে উপজাত হিসেবে এক ধরণের অত্যন্ত অম্লীয় এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল বর্জ্য নির্গত হয়, যাকে বলা হয় ‘ভিনাস’ (Vinasse)। পরিবেশ নিয়ামক সংস্থাগুলির মতে, এই শিল্পটি অত্যন্ত দূষণকারী বা ‘রেড ক্যাটাগরি’ (Red Category)-র অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় এই বিষাক্ত বর্জ্য উপযুক্ত পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি পার্শ্ববর্তী নদী বা নালায় ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে নদীর জল বিষাক্ত হয়ে পড়ে, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি পায় এবং সংলগ্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ জলও পানের অযোগ্য হয়ে ওঠে।
ইথানল মিশ্রণ নীতি দেশের খনিজ তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলেও, পরিবেশের মানদণ্ডে এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। প্রথম প্রজন্মের (1G) ইথানল—যা সরাসরি খাদ্যশস্য থেকে তৈরি হয়—তা পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
পরিবেশবিদদের মতে, যদি আমাদের সত্যিই কার্বন নিঃসরণ কমাতে হয়, তবে খাদ্যশস্যের বদলে কৃষিজাত বর্জ্য, খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং শৈবাল থেকে তৈরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের (2G & 3G) বায়োফুয়েল প্রযুক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সাথে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) পরিকাঠামো উন্নত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণই হতে পারে পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদী পথ। সবুজ জ্বালানির নামে প্রকৃতির বুক চিরে জল ও বন ধ্বংসের এই অন্ধ দৌড় বন্ধ না হলে, আগামী দিনে পরিবেশের ক্ষতি সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
