ডিজিটাল ডেস্ক: সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে স্মার্টফোনের একটি অ্যাপ ব্যবহার করে চলন্ত ই-রিকশা বা টোটোর সঙ্গে ব্লুটুথ সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। ভিডিওগুলোর দাবি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ই-রিকশাটি হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ই-রিকশা চালক, মালিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সত্যিই সম্ভব, নাকি কেবল ভাইরাল হওয়ার জন্য তৈরি করা কনটেন্ট?
ভাইরাল ভিডিওগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে BAT-BMS নামের একটি অ্যাপ। এছাড়া বিভিন্ন নির্মাতার নিজস্ব BMS (Battery Management System) অ্যাপও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এসব অ্যাপ মূলত ব্যাটারির চার্জ, ভোল্টেজ, তাপমাত্রা, সেলের অবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। অ্যাপগুলোর উদ্দেশ্য ব্যাটারি নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ করা, ই-রিকশা বন্ধ করা নয়।
প্রযুক্তিগতভাবে একটি ই-রিকশার লিথিয়াম ব্যাটারির সঙ্গে একটি Battery Management System (BMS) যুক্ত থাকে। এই BMS ব্যাটারির নিরাপত্তা, চার্জিং এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক BMS-এ ব্লুটুথ সুবিধা থাকে, যাতে মোবাইল ফোন থেকে ব্যাটারির তথ্য দেখা যায়।
সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনো BMS-এ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। যদি ব্লুটুথ সংযোগে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, অথেনটিকেশন বা এনক্রিপশন না থাকে, তাহলে কাছাকাছি অবস্থান থেকে অন্য কেউ সেই BMS-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করতে পারে।
কিছু ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সংযোগ স্থাপনের পর BMS-এর নির্দিষ্ট একটি সেটিং পরিবর্তন করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, এর ফলে ব্যাটারির আউটপুট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়ে ই-রিকশার মোটরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং গাড়িটি থেমে যাচ্ছে। তবে ভিডিওতে দেখানো প্রতিটি ঘটনা ঠিক এই পদ্ধতিতেই ঘটেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বাজারে থাকা অনেক ই-রিকশায় ব্লুটুথ-সক্ষম BMS-ই নেই। আবার যেসব BMS-এ ব্লুটুথ রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পাসওয়ার্ড এবং অথেনটিকেশন ব্যবহার করা হয়। ফলে সব ই-রিকশাকে একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়।
ঝুঁকি মূলত সেইসব ব্যাটারিতে বেশি, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল অথবা ডিফল্ট কনফিগারেশন পরিবর্তন করা হয়নি।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন ই-রিকশা চালকেরা। চলন্ত অবস্থায় গাড়ি হঠাৎ থেমে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যাত্রীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এছাড়া দিন আনা দিন খাওয়া বহু চালকের জন্য গাড়ি অচল হয়ে যাওয়া মানে তাৎক্ষণিকভাবে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, অর্থনৈতিক ও জননিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। বর্তমানে যানবাহন, ব্যাটারি, ক্যামেরা, তালা থেকে শুরু করে নানা ডিভাইস স্মার্টফোনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু যদি এসব ডিভাইসে যথেষ্ট নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে সেগুলো অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকেই যায়।
ভাইরাল ভিডিওগুলো সেই সম্ভাব্য দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তবে “একটি অ্যাপ দিয়ে যেকোনো চলন্ত টোটো মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়া যায়”—এমন দাবি প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। এটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশায় ব্যবহৃত BMS-এর ধরন, নির্মাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যার কনফিগারেশনের ওপর।
বর্তমানে বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে ই-রিকশায় ব্যবহৃত স্মার্ট ব্যাটারি প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
