মুম্বাই: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে ফের প্রবল বর্ষণের মুখে ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাই। শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল থেকেই দক্ষিণ মুম্বাইসহ অন্ধেরি, মুলুন্দ, থানে ও আশপাশের একাধিক এলাকায় ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষকদের মতে, আরব সাগর থেকে আসা ঘন মেঘের প্রভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। এর জেরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জল জমা, যান চলাচলে বিঘ্ন এবং জনজীবনে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মুম্বাই এমনিতেই ভারতের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ শহর। প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শহরে গড়ে ২,০০০ থেকে ২,৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে সান্তাক্রুজ এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি, আর কোলাবায় কিছুটা কম। তবে অতিবৃষ্টির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করছে এই মহানগর।
ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ আমলে সাতটি দ্বীপকে ভরাট করে বর্তমান মুম্বাই গড়ে তোলার পর থেকেই শহরের প্রাকৃতিক জলনিকাশ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে ভারী বর্ষণের সময় জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি ক্রমেই বেড়েছে। ১৯৪৬ সালে ২৪ ঘণ্টায় ৭১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল, যা সে সময়ের অন্যতম বড় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে মুম্বাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বর্ষণ ঘটে ২০০৫ সালের ২৬ জুলাই। সেদিন মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সান্তাক্রুজে ৯৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, যা এখনও শহরের সর্বোচ্চ। অতিবৃষ্টিতে মিথি নদী উপচে পড়ে, রেল, সড়ক ও বিমান পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই দুর্যোগে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
এরপরও একাধিকবার ভয়াবহ বৃষ্টির মুখে পড়েছে মুম্বাই। ২০১৭ সালে ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৪৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ২০২০ সালেও আগস্ট মাসে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতি ভারী বর্ষণের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে বলে আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরব সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক মেঘের সৃষ্টি, দ্রুত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা—সব মিলিয়েই মুম্বাইয়ের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ মুম্বাইয়ে ইতিমধ্যেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে এবং আগামী কয়েক ঘণ্টায় বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। ফলে নিম্নাঞ্চলে জল জমা, যানজট এবং গণপরিবহন পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক বাসিন্দা স্কুল-কলেজ ও অফিসে ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
২০০৫ সালের ভয়াবহ বন্যার পর শহরে জল ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘আইফ্লোস-মুম্বাই’র মতো আধুনিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথি নদীর সংস্কার, জলাভূমি সংরক্ষণ, উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
প্রতিবছর বর্ষাকালে মুম্বাইয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়েন লক্ষাধিক মানুষ। তাই ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মাথায় রেখে আরও কার্যকর বন্যা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
