হায়দরাবাদ: মার্কিন গবেষক ও হায়দরাবাদের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির Center for Arab and Islamic Studies-এর পরিচালক অধ্যাপক মাইকেল ডি. ক্যালাব্রিয়া সম্প্রতি হায়দরাবাদের সালার জং মিউজিয়ামে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোগল যুগের ধর্মীয় বহুত্ববাদ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সম্প্রীতির উচ্চ প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, ভারতের ইতিহাসে মোগল যুগ এমন এক অধ্যায়, যা আজও বিশ্বের জন্য সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
বুধবার দিল্লি আর্ট গ্যালারি এবং লেখক-গবেষক রানা সাফভির প্রদর্শনী “The Mute Eloquence of the Taj Mahal (Ba-Zaban-e Be-Zabani)”-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠান শেষে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মোগল সাম্রাজ্যের ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদই তাঁকে এ বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অধ্যাপক ক্যালাব্রিয়া প্রথমে কায়রোতে ইজিপ্টোলজি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ইসলামি ইতিহাস ও মোগল যুগ নিয়ে দীর্ঘ প্রায় চার দশক গবেষণা করেন। তাঁর ২০২১ সালে প্রকাশিত বই “The Language of the Taj Mahal”-এ তিনি দাবি করেন, তাজমহলকে কেবল প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। তাঁর মতে, এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক স্থাপত্য, যার দেয়ালে পবিত্র কুরআনের আয়াত খোদাই করা রয়েছে।
তিনি বলেন, মোগল যুগ ছিল বিভিন্ন ধর্ম, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির মানুষের এক অসাধারণ মিলনক্ষেত্র। পারস্পরিক সহযোগিতা, জ্ঞানচর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে সেই সময়ে বহু অনন্য শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, এই বহুত্ববাদ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতিই বিশ্বের প্রতি ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার।
বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মেরুকরণ ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া আজ আরও বেশি জরুরি। তাঁর মতে, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সংঘাতই চিরন্তন বাস্তবতা—এমন ধারণা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। বরং ইসলাম, খ্রিস্টধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতার মানুষের পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমেই মানবসভ্যতার অনেক শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মোগল সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, বহুত্ববাদ কোনও দুর্বলতা নয়; বরং এটি একটি শক্তি, যা সমাজকে আরও সমৃদ্ধ ও সৃজনশীল করে তোলে। সেই কারণেই ভারতের এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে শুধু দেশের সম্পদ হিসেবে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক মূল্যবান বার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
পরিশেষে অধ্যাপক ক্যালাব্রিয়া পবিত্র কুরআনের ভাষাগত সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং তাজমহলের স্থাপত্যে তার প্রতিফলনের বিষয়েও আলোকপাত করেন। তাঁর মতে, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করলেই ভবিষ্যতে আরও শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
