পটনা, ১৯ জুলাই: পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি ও বিতর্কিত নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে বিহার জুড়ে ডাকা ‘বিহার বন্ধ’-এর ঠিক প্রাক্কালে প্রধান সামাজিক ও বামপন্থী নেতাদের বেআইনিভাবে গ্রেফতারির ঘটনায় চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। প্রশাসনিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং দমনপীড়নের প্রতিবাদে সরব হয়ে এই গ্রেফতারি প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা ও ভর্ৎসনা জানাল সামাজিক ও রাজনৈতিক দল ‘সিপিআই (এমএল) লিবারেশন’। রাজ্য সরকারের এই ধরপাকড়কে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের নজিরবিহীন চেষ্টা বলে অভিহিত করে বামপন্থী দলটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, মামলা-মোকদ্দমা বা পুলিশের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত মূল প্রভাবশালী অপরাধীদের আড়াল করতেই কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসন সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে চাইছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়েছে।
সংবাদসংস্থা মাকতুবের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, দেশজুড়ে শোরগোল ফেলা মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG)-র প্রশ্নপত্র লিক এবং ফলাফলে মারাত্মক কারচুপির ঘটনার প্রতিবাদে রাজ্যব্যাপী ‘বিহার বন্ধ’-এর ডাক দিয়েছিল বিভিন্ন বিরোধী ছাত্র, যুব ও সামাজিক সংগঠন। এই কর্মসূচির মূল দাবি ছিল স্বচ্ছ তদন্ত, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি এবং পরীক্ষা পুনর্পরিচালনা। তবে বিহার বন্ধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই অতর্কিতে অভিযানে নামে পুলিশ। পটনা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতা এবং কর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার ও পুলিশি হেফাজতে আটক করা হয়।
সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের রাজ্য নেতৃত্বের তরফে এক বিশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিট প্রশ্নফাঁস কেবল কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়, বরং এটি দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এবং পরিশ্রমকে ধ্বংস করার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন পুরো দেশের সঙ্গে বিহারের সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছিল, ঠিক তখনই নীতিহীনভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করল নীতিশ কুমার ও বিজেপির যৌথ সরকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হওয়া নেতাদের গ্রেফতার করে প্রকৃতপক্ষে সরকার প্রমাণ করল তারা দুর্নীতির চক্রকে আড়াল করতে কতটা মরিয়া।
দলটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ তোলা হয়, গ্রেফতার হওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের প্রতিবাদ জাহির করার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যই তাঁদের বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এনডিএ সরকার নাগরিকদের সংবিধানপ্রদত্ত সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনের অধিকারকে সরাসরি কুক্ষিগত করতে চাইছে। অবিলম্বে সমস্ত আটক নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং তাঁদের ওপর চাপানো সমস্ত মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গতঃ, এ বছর নিট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সারা দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে বিহার থেকে একাধিক চক্রের সন্ধান মেলে, যারা পরীক্ষার আগেই কোটি টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা গড়ায় এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) তদন্তভার হাতে নেয়। তবে বিরোধী দলগুলির মতে, প্রশ্নফাঁসের আসল হোতারা ও ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র ভেতরের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন, অথচ ভুক্তভোগী পড়ুয়া এবং তাঁদের অধিকারের দাবিতে লড়াই করা সমাজকর্মীদের ওপর নামিয়ে আনা হচ্ছে নির্মম অত্যাচার।
সিপিআই (এমএল) লিবারেশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, গ্রেফতারি বা গ্রেফতারির হুমকি দিয়ে ছাত্র-যুবদের ন্যায়বিচারের লড়াইকে দমানো অসম্ভব। বিহার বন্ধ কর্মসূচিকে প্রতিহত করার জন্য প্রশাসনিকভাবে শত চেষ্টা করা হলেও রাজ্যের আপামর জনগণ এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে নিজেদের জবাব দেবে। যদি অবিলম্বে গ্রেফতার করা নেতাদের মুক্তি না দেওয়া হয় এবং নিট কেলেঙ্কারির সঠিক সমাধান না ঘটে, তবে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র ও সর্বাত্মক আকার ধারণ করবে বলে চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এই গ্রেফতারির ঘটনায় বিহারের অন্যান্য রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, যার ফলে নিট কেলেঙ্কারির জল এবার রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামাজিক সীমানা পেরিয়ে দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিল।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
