মুম্বই, ১৭ জুলাই: ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (আরআইএল) চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে এক শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল পেশ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারের একাধিক প্রতিকূলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও সংস্থার মূল চালিকাশক্তি তথা অয়েল-টু-কেমিকালস (ওটুসি) এবং টেলিকম ব্যবসার অভাবনীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই এই সাফল্য এসেছে।
ত্রৈমাসিক ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, এপ্রিল-জুন মেয়াদে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২০,৯৪৬ কোটি টাকা। যদিও গত বছরের একই সময়ের (২৬,৯৯৪ কোটি টাকা) তুলনায় এই নিট মুনাফা প্রায় ২২.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তবুও এটি বাজার বিশ্লেষকদের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের পূর্বানুমান ছিল যে, এই ত্রৈমাসিকে রিলায়েন্সের নিট মুনাফা হতে পারে প্রায় ১৯৮.২৩ বিলিয়ন রুপি বা ১৯,৮২৩ কোটি টাকা। ফলে বিশ্লেষকদের সেই হিসেবকে সহজেই টপকে গেছে ভারতের সবচেয়ে মূল্যবান এই সংস্থাটি।
রয়টার্সের তথ্যানুসারে, গত বছরের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে এশিয়ান পেইন্টসের শেয়ার বিক্রি থেকে ৮,৯২৪ কোটি টাকার একটি এককালীন বিশেষ লাভ (One-off gain) হয়েছিল রিলায়েন্সের। সেই উচ্চ ভিত্তির (High Base) কারণে এ বছরের বার্ষিক নিট মুনাফায় ২২.৪ শতাংশের পতন দেখা গেলেও, সংস্থার অন্তর্নিহিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। এই এককালীন লাভ বাদ দিলে রিলায়েন্সের নিট মুনাফা মূলত ১৫.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে, প্রথম ত্রৈমাসিকে রিলায়েন্সের মোট কার্যক্ষম রাজস্ব (Revenue from operations) বার্ষিক ২৫.৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৩,১১,৮৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে এর পাশাপাশি কাঁচামাল ব্যবহারের খরচও প্রায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
গত কয়েক দশকে রিলায়েন্স রিটেল, টেলিকম ও গ্রিন অ্যানার্জির মতো ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটালেও সংস্থার আয়ের প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে এখনও কাজ করছে তাদের ঐতিহ্যবাহী তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবসা। গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম রিফাইনারি কমপ্লেক্সের মালিক রিলায়েন্স মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নজনিত সমস্যার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাস্কেটে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানির দক্ষ বিপণনের মাধ্যমে এই ত্রৈমাসিকে ওটুসি (Oil-to-Chemicals) বিভাগের কোর আর্নিংস বা এডিটডা (EBITDA) ১৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭,০১০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সংস্থার চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি এক বিবৃতিতে জানান, “বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি এবং ব্যাহত সরবরাহ শৃঙ্খল থাকা সত্ত্বেও আমাদের ওটুসি ব্যবসা চমৎকার পারফর্ম করেছে, যা মূলত মিডল ডিস্টিলেট ক্র্যাকস এবং পেট্রোকেমিক্যালের উন্নত মার্জিনের কারণে সম্ভব হয়েছে”।
রিলায়েন্সের ডিজিটাল এবং টেলিকম শাখা ‘জিও প্ল্যাটফর্মস লিমিটেড’ (জেপিএল) এই ত্রৈমাসিকে আরেকটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিও-র কোর আর্নিংস (EBITDA) ১৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ২০,৮৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যেখানে তাদের মার্জিন ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৫৩.৩ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে জিও-র মোট গ্রাহক সংখ্যা ৫৩.৩ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে ২৮.৫ কোটি গ্রাহক সরাসরি জিও-র True5G নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। উন্নত সাবস্ক্রাইবার মিক্সের কারণে ব্যবহারকারী প্রতি গড় রাজস্ব (ARPU) ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২১৫.৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই সাফল্যের মধ্যেই দেশের শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)-র কাছে ড্রাফট রেড হেরিং প্রসপেক্টাস (DRHP) জমা দিয়েছে জিও, যা ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম পাবলিক লিস্টিং (IPO) হতে চলেছে।
গ্রাহক-কেন্দ্রিক ব্যবসার অপর স্তম্ভ রিলায়েন্স রিটেলের মোট রাজস্ব এ ত্রৈমাসিকে ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও নিট মুনাফা কিছুটা কমে ২,৮০৬ কোটি টাকা হয়েছে। বিশেষ করে কুইক কমার্স বা দ্রুত ডেলিভারি পরিষেবার পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে রিটেল মার্জিনে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে টেলিকম এবং তেল শোধনাগারের জোড়া ফলার ওপর ভর করেই রিলায়েন্স চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে দালাল স্ট্রিটের সমস্ত অনুমানকে পেছনে ফেলে এক দৃঢ় সূচনা করেছে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
