সবুজ বিপ্লবে নয়া নজির: ভারতে চলল দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেন ট্রেন!

সবুজ বিপ্লবে নয়া নজির: ভারতে চলল দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেন ট্রেন!

নয়াদিল্লি, ১৮ জুলাই: পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল ভারত। দেশের বিশাল রেল নেটওয়ার্কে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনের সফল সূচনা হলো। শুক্রবার উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে এই পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক ট্রেনের চাকা গড়াল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হরিয়ানার জিন্দ রেলওয়ে স্টেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশেষ ট্রেনের উদ্বোধন করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে “নমো গ্রিন রেল” (NaMo Green Rail)। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লেখেন, “স্বনির্ভর ভারত এবং টেকসই উন্নয়নের অভিমুখে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন”।

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ পাইলট প্রজেক্টটির মাধ্যমে ভারতের রেল ব্যবস্থায় হাইড্রোজেন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন সংরক্ষণাগার এবং রিফুয়েলিং পরিকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ডিজেল চালিত ট্রেনের বিকল্প হিসেবে যেখানে এখনও সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিকীকরণ সম্ভব হয়নি, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেনকে সবচেয়ে সেরা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এসোসিয়েটেড প্রেস (AP)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ভারতে তৈরি এই হাইড্রোজেন ট্রেনটিতে রয়েছে দুটি হাইড্রোজেন চালিত ড্রাইভিং পাওয়ার কার (Driving Car) এবং আটটি সাধারণ যাত্রী কোচ। ট্রেনটি সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার (৪৭ মাইল) গতিবেগে চলতে সক্ষম। রেলওয়ে সূত্রে জানানো হয়েছে, ট্রেনটি একবারে সর্বোচ্চ প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে চালিত এই ইঞ্জিনে কোনো প্রথাগত জ্বালানি দহন হয় না। ফলে ট্রেনটি চলাচলের সময় কোনো ক্ষতিকারক ধোঁয়া বা কার্বন নির্গমন হবে না।

হাইড্রোজেন ট্রেনের মূল চালিকাশক্তি হলো এর ফুয়েল সেল। এই ফুয়েল সেলের ভেতরে মজুত থাকা হাইড্রোজেন এবং বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের মধ্যে একটি বিশেষ তড়িৎ-রাসায়নিক বিক্রিয়া বা ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল রিঅ্যাকশন ঘটে। এই বিক্রিয়ার ফলেই অনবরত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা ট্রেনটিকে গতিশীল রাখে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রযুক্তির একমাত্র উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হলো জলীয় বাষ্প এবং সামান্য তাপ। ফলে এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং এর থেকে কোনো দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে না।

আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি মেনে ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমনের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার অর্থাৎ ‘নেট-জিরো’ (Net-Zero emissions) অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর সেই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের অংশ হিসেবেই ভারতীয় রেলওয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনের ব্যবহার শুরু করল। বর্তমানে দেশের বেশ কিছু রুটে যেখানে এখনও ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জার্মানি বা চীনের মতো বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের তালিকায় এবার ভারতও নাম লেখালো, যারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ট্রেন তৈরি ও সফলভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন।

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply