দোহা, ১৭ জুলাই:ইসলাম ও মুসলিম সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমি বিশ্বের চিরাচরিত ও ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দেওয়া প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক, লেখক এবং অধ্যাপক জন এল এসপোসিটো প্রয়াত হয়েছেন। গত ১৫ জুলাই হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারজনিত জটিলতার কারণে ৮৬ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি একদিকে যেমন প্রাচ্যবাদী (Orientalist) অন্ধ গোঁড়ামিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন, তেমনই অন্যদিকে ইসলামের আধুনিক পঠন-পাঠনকে সম্পূর্ণ এক নতুন রূপ দিয়েছেন। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধে গবেষক নাদের হাশেমি জানিয়েছেন, অধ্যাপক এসপোসিটোর প্রয়াণ বিশ্বজুড়ে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও বহুত্ববাদের চর্চায় এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।
১৯৪০ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের এক ইতালীয়-আমেরিকান ক্যাথলিক শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জন এসপোসিটো। প্রথম জীবনে ক্যাথলিক যাজক হওয়ার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে তিনি ‘ক্যাপুচিন ফ্রান্সিসকান অর্ডার’-এ যোগ দিলেও, পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন। টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান গবেষক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকির অধীনে তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এই শিক্ষাই ইসলামের নিজস্ব সত্তা ও মূল্যবোধকে পশ্চিমি সংশয় বা আশঙ্কার ঊর্ধ্বে উঠে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর জীবনব্যাপী দর্শনকে রূপ দিয়েছিল।
বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব এবং পরবর্তী সময়ে ৯/১১-এর প্রোপটে যখন ইসলাম ও পশ্চিমি বিশ্বের সম্পর্ক চরম মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এসপোসিটো অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সমকালীন ভূ-রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে অধিকাংশ পশ্চিমি বুদ্ধিজীবী এবং নীতিনির্ধারকেরা যখন ইসলামকে কেবল একটি বৈশ্বিক হুমকি বা সহিংস ও উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতেন, তখন এসপোসিটোই প্রথম সেই সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলোকে সামনে আনেন, যা মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক ইসলামের আবেদনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
অধ্যাপক এসপোসিটোর গবেষণার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিকে কোনো পশ্চিমি কাঠামোর মাপকাঠিতে বিচার করেননি। বরং তিনি মুসলিম সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের ধর্মীয় পরিচিতির গভীরতা থেকে বিষয়টিকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছিলেন। যেখানে অধিকাংশ মূলধারার পশ্চিমি পণ্ডিত কেবল ‘শরিয়া আইন’ বাস্তবায়নের বিষয়টির ওপর সংকীর্ণ আলোকপাত করতেন, সেখানে এসপোসিটো রাজনৈতিক ইসলামের পেছনের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন, যা হলো— মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং বহিরাগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ।
উপনিবেশবাদের কালো অধ্যায়, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে মুসলিম মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করেছে, তা তাঁর বিভিন্ন যুগান্তকারী লেখায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত তাঁর প্রায় ৫৫টিরও বেশি গ্রন্থ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর লেখা ‘ইসলাম: দ্য স্ট্রেইট পাথ’, ‘দ্য ইসলামিক থ্রেট: মিথ অর রিয়ালিটি?’, এবং ডালিয়া মোজাহেদের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা ‘হু স্পিকস ফর ইসলাম? হোয়াট আ বিলিয়ন মুসলিমস রিয়ালি থিঙ্ক’ বিশ্বজুড়ে সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি অধ্যাপক এসপোসিটো। ১৯৯৩ সালে তিনি জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে ‘সেন্টার ফর মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (পরবর্তীতে প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল সেন্টার) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই বিশ্বজুড়ে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ইসলামভীতি বা মুসলিম-বিদ্বেষকে রুখতে এবং তা তদারকি করতে ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্প চালু করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের ধর্মীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে সওয়াল করে গেছেন। ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের পক্ষে কিংবা বৈশ্বিক মঞ্চে মানবাধিকারের সুরক্ষায় তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার।
একটি গভীর ধর্মান্ধতা ও বিদ্বেষের যুগে জন এসপোসিটোর মতো পণ্ডিতদের অবদান ছিল আলোর দিশারির মতো। তিনি ইসলামকে কোনো বিমূর্ত শত্রু বা অচেনা সংস্কৃতি হিসেবে না দেখে মানুষের একটি বৈশ্বিক নৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রতিটি মানুষ তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অবদানের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে।
বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক বিশ্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নিয়মিত বাংলাকাল-কে ফলো করুন।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
