কলকাতা, ১৭ জুলাই: বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ক্রিকেট রোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর করে তোলা অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাদুকর, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার গারফিল্ড ‘গ্যারি’ সোবার্স আর নেই। শুক্রবার ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশন্যাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এবং ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ অত্যন্ত গভীর শোকপ্রকাশের সাথে তাঁর প্রয়াণের খবরটি নিশ্চিত করেছে। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর ৮৯ বছর পূর্ণ করে ৯০তম জন্মদিনের ঠিক ১০ দিন পূর্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্ত এবং প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড়দের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ এক বিবৃতিতে কিংবদন্তি এই ক্রিকেটারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “আজ ক্রিকেট বিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইকনকে হারাল। স্যার গারফিল্ড সোবার্স শুধু খেলার ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সামগ্রিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আমি স্যার গারফিল্ডের পরিবার, বন্ধুবর্গ, ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত ক্রিকেট ভক্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।” ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজও তাদের অফিসিয়াল বার্তায় শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে লিখেছে, “একটি মহান ইনিংসের সমাপ্তি ঘটল। আমাদের হৃদয়ে, আজ এবং চিরকাল আপনি থাকবেন, স্যার গারফিল্ড সোবার্স।”
১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক জুড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে রাজত্ব করেছেন বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেট ঈশ্বর। ব্যাটিং, বোলিং থেকে শুরু করে ফিল্ডিং— ক্রিকেটের প্রতিটি বিভাগেই তিনি যে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আধুনিক ক্রিকেটবিশ্বের জন্য এক অনন্য রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল। একজন মারকুটে বাঁহাতি ব্যাটার হিসেবে যেমন তিনি বোলারদের ত্রাস ছিলেন, ঠিক তেমনি বল হাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। সোবার্স একই সাথে বাঁহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং, প্রথাগত অর্থোডক্স স্পিন এবং রিস্ট স্পিন বা গুগলি করতে পারতেন। তাঁর এই বহুমুখী বোলিং বৈচিত্র্য তৎকালীন বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল。 এর পাশাপাশি স্লিপ ফিল্ডার হিসেবেও তাঁর ক্যাচ ধরার দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্যার গ্যারি সোবার্স তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। সেখানে ৫৭.৭৮ এর অবিশ্বাস্য গড়ে তিনি মোট ৮,০৩২ রান সংগ্রহ করেন। যার মধ্যে রয়েছে ২৬টি চোখ ধাঁধানো শতরান এবং ৩০টি অর্ধশতরান। অন্যদিকে, বল হাতেও তিনি লাল বলের ক্রিকেটে ২৩৫টি উইকেট শিকার করার অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ক্যারিবিয়ান দলের অধিনায়কত্ব সামলেছেন এবং মোট ৩৯টি টেস্ট ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি এসেছিল ১৯৫৮ সালে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সাবিনা পার্কে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি অপরাজিত ৩৬৫ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন, যা তৎকালীন সময়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড হিসেবে নাম লেখায়। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে এই রেকর্ডটি অক্ষুণ্ণ ছিল, যা পরবর্তীকালে ১৯৯৪ সালে অপর ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ভেঙেছিলেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটেও তাঁর একটি অবিস্মরণীয় নজির রয়েছে। ১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামারগনের বিপক্ষে কাউন্টি ক্রিকেটে এক ওভারে ৬টি ছক্কা মেরে ক্রিকেট বিশ্বে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন তিনি, যেখানে বোলার ছিলেন ম্যালকম ন্যাশ। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মারার অনন্য ঘটনা।
খেলাধুলোয় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ২০০০ সালে উইজডেন কর্তৃক শতাব্দীসেরা পাঁচজন ক্রিকেটারের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন স্যার গ্যারি সোবার্স। এমনকি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আইসিসির বার্ষিক শ্রেষ্ঠ পারফর্মারকে যে সর্বোচ্চ সম্মাননা দেওয়া হয়, তার নামও এই মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি’ রাখা হয়েছে। তাঁর চলে যাওয়া বিশ্ব ক্রিকেটে এমন এক শূন্যতা তৈরি করল, যা কোনোদিনও পূরণ হবার নয়। মাঠের ভেতরের আগ্রাসন আর মাঠের বাইরের অমায়িক স্বভাবের কারণে ক্রিকেট দুনিয়া তাঁকে চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
