নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখলে একটা পরিচিত কৌশল চোখে পড়ে। প্রায় দেড় কোটি ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে সংখ্যাটা এতটাই বিশাল যে সাধারণ মানুষের কাছে তা কার্যত অর্থহীন হয়ে যায়। এই বিশাল প্রশাসনিক উদ্যোগকে ‘জাস্টিফাই’ বা বৈধতা দেওয়ার জন্য কমিশন যেন এখন এক কৌশলগত অনুশীলনে নেমেছে। আর সেই অনুশীলনের দৃশ্যমান মুখ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে অমর্ত্য সেনের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের।
কমিশন খুব ভালো করেই জানে দেড় কোটির হিসাব সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। কিন্তু যখন অমর্ত্য সেন বা তাঁর মতো হাই-প্রোফাইল কাউকে নোটিস পাঠানো হয়, তখন মিডিয়া স্বাভাবিকভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্রেকিং নিউজ, টক শো, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্তেজনা সব মিলিয়ে একটা বার্তা প্রতিষ্ঠা করা হয়: “দেখুন, আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না।”
এখানে প্রশ্ন অমর্ত্য সেনের নির্দোষিতা বা দোষ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁকে একটি প্রতীকে পরিণত করে কীভাবে এই বিশাল প্রক্রিয়াটিকে জনমানসে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হচ্ছে। বড় মাছ জালে তুলে ছোট মাছদের চুপ করিয়ে রাখার এক পরিচিত কৌশল।
মিডিয়া যখন অমর্ত্য সেনকে ঘিরে সরগরম, তখন বাকি দেড় কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ কিন্তু অন্ধকারের আড়ালেই থেকে যায়। এই বিশাল নোটিস অভিযানের লক্ষ্য কি শুধুই ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করা?
সাংবাদিক অপর্ণা ভট্টাচার্য ( Aparna Bhattacharya ) দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত একটি তথ্যনিষ্ঠ প্রতিবেদনে এই প্রশ্নেরই অস্বস্তিকর দিকগুলো সামনে এনেছেন।
অপর্ণা ভট্টাচার্যের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নোটিস পাঠানোর হার সবচেয়ে বেশি সেই জেলাগুলোতে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি।
মুর্শিদাবাদ: প্রায় ৩০.২০% ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে
মালদা: ২৮.৪২%
উত্তর দিনাজপুর: ২৯.৭৫%
অন্যদিকে বাঁকুড়া বা পুরুলিয়া (যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ১০%-এর নিচে), সেখানে এই হার মাত্র ১০–১৩%।
এই বৈষম্য কাকতালীয় বলেই কি ধরে নেওয়া যায়?
আসল প্রশ্নটা এখানেই, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে ভোটারদের তথ্য ভেরিফিকেশন বা ‘ম্যাপিং’ ইতিমধ্যেই ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন। অর্থাৎ নথিপত্র ঠিক থাকার পরেও সফটওয়্যারের তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র অজুহাতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাঁকুড়ার তুলনায় মুর্শিদাবাদের একজন ভোটারের নোটিস পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিন গুণ বেশি।
যেখানে ডেটাই কথা বলছে, সেখানে ‘প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা’ আদৌ কতটা নিরপেক্ষ সেই প্রশ্নটা অনিবার্যভাবে উঠে আসে।
হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের নোটিস পাঠিয়ে এক ধরনের ‘আইওয়াশ’ অর্থাৎ দৃশ্যমান স্বচ্ছতা দেখিয়ে কাঠামোগত প্রশ্নগুলো আড়াল করার চেষ্টা চলছে কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি যখন সেলিব্রিটিদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, তখন নিঃশব্দে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া অনেক সহজ হয়।
দেড় কোটি মানুষের এই হয়রানি কি সত্যিই গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার অনুশীলন, নাকি নির্দিষ্ট জনবিন্যাসকে টার্গেট করার এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা এই প্রশ্নটা আজ তোলা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্য।
দ্য ওয়ারে প্রকাশিত লেখার লিঙ্ক এখানে ক্লিক করে পড়া যাবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
