কলকাতা, ২১ জুলাই: খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে এবার বড়োসড়ো পদক্ষেপ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দেশের মানচিত্রে একটি হাইড্রোকার্বন উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্যে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নবান্নের তরফে। রাজ্যের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা— মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পূর্ব বর্ধমানে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন বা ওএনজিসি-কে (ONGC) প্রয়োজনীয় লিজ বা ইজারা প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিধানসভায় শিল্প, বাণিজ্য ও উদ্যোগ দপ্তরের বাজেট পেশ করার সময় এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি করেছেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। বিধানসভার অধিবেশনে এই ঘোষণা রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বিধানসভায় তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে জানান যে, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস রুলস, ২০২৫-এর কঠোর নির্দেশিকা মেনে ওএনজিসি-কে এই বিশেষ ইজারা দেওয়া হয়েছে। মূলত মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া জেলা মিলিয়ে মোট ২৮৭২.৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি সুবিশাল ব্লকে খনিজ তেল এবং গ্যাসের অনুসন্ধান চালাবে এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। সরকারের সঙ্গে ওএনজিসি-র হওয়া রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির বা রেভিনিউ শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-এর নিয়ম অনুযায়ী, এই ব্লক থেকে উৎপাদিত খনিজ সম্পদের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার নিয়মমাফিক রয়্যালটি এবং রাজস্ব পাবে বলে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রী। এই বিপুল পরিমাণ এলাকায় অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সফল হলে তা রাজ্যের অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধুমাত্র তেল অনুসন্ধানই নয়, এর পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর ক্ষেত্রে সরাসরি খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জন্যও পেট্রোলিয়াম মাইনিং লিজ অনুমোদন করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ওএনজিসি-র নেলপ (NELP) ব্লক (WB-ONN-2005/4)-এর অন্তর্গত প্রায় ৯৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই বাণিজ্যিক উত্তোলনের কাজ চলবে। রাজ্য সরকারের প্রাথমিক অনুমান, এই অশোকনগর প্রকল্প থেকে রয়্যালটি বাবদ রাজ্যের কোষাগারে প্রায় ১০৪ কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব জমা পড়বে। এই প্রকল্পের হাত ধরেই ভারতের হাইড্রোকার্বন উৎপাদনের মানচিত্রে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ, যা রাজ্যের দীর্ঘদিনের একটি বড় স্বপ্ন ছিল এবং যা আগামী দিনে রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামোকে অনেকটাই মজবুত করবে।
বাণিজ্যিকভাবে অশোকনগর ক্ষেত্র থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন শুরু হলে বেঙ্গল বেসিনের মর্যাদাও সর্বভারতীয় স্তরে অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বেঙ্গল বেসিন ক্যাটাগরি-থ্রি পাললিক অববাহিকা হিসেবে পরিচিত। ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় যার অর্থ হলো, এখানে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু অশোকনগরে পুরোদমে উৎপাদন শুরু হলেই এটি ক্যাটাগরি-ওয়ান অববাহিকায় উন্নীত হবে। ক্যাটাগরি-ওয়ান তকমা পাওয়ার অর্থ হলো, সেই নির্দিষ্ট এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সফল উৎপাদন সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত হয়েছে। শিল্পমন্ত্রী জানান, সরকারের এই জোড়া উদ্যোগ শুধু রাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তাই সুনিশ্চিত করবে না, এর ফলে আপস্ট্রিম পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে প্রচুর নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং অনুসন্ধান, উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
তেল উত্তোলনের পাশাপাশি রাজ্যে গ্যাস বন্টন ব্যবস্থা নিয়েও বেশ কিছু বড় আপডেট দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। তিনি বিধানসভায় জানান, সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের আওতায় গেল (GAIL) ইন্ডিয়া লিমিটেডের তরফ থেকে বর্তমানে ৭৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। এই বৃহৎ পরিকাঠামো মূলক প্রকল্পে মোট ৫,৩২২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে রাজ্য জুড়ে সিএনজি-চালিত পরিবহণ ব্যবস্থার দ্রুত প্রসার ঘটবে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার অনেকটাই বাড়বে।
অন্যদিকে, রাজ্যে বেআইনি খাদান ও খনিজ পাচার রুখতে একটি কড়া প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজ্য সরকার। এবার থেকে গৌণ খনিজ পদার্থ বা মাইনর মিনারেলস পরিবহণকারী সমস্ত ট্রাকে ভেহিকেল লোকেশন ট্র্যাকিং ডিভাইস (VLTD) বসানো বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে খনি থেকে গন্তব্যস্থল পর্যন্ত খনিজের রিয়েল-টাইমে নিখুঁত নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। এর ফলে বেআইনি পরিবহণ যেমন কমবে, তেমনই সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়াও বন্ধ হবে।
বাংলাকাল-কে ফলো করুন
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
